ছুটি ছাড়াই বিদেশযাত্রা, চাকরি হারালেন এনবিআর কর্মকর্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৩ বার
ছুটি ছাড়াই বিদেশযাত্রা, চাকরি হারালেন এনবিআর কর্মকর্তা

প্রকাশ: ১৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনে দায়িত্বশীল পদে কর্মরত এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং যথাযথ অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থানকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রথম সচিব (মূসক পরিবীক্ষণ ও করদাতা সেবা) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী তানজিনা রইসের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সংস্থার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তানজিনা রইসকে চাকরি থেকে অপসারণের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় তদন্ত, কারণ দর্শানোর নোটিশ, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তার বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরিচ্যুতির আদেশ কার্যকর করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর তানজিনা রইসকে এক মাসের অর্জিত ছুটি মঞ্জুর করা হয়। ওই ছুটিতে তিনি থাইল্যান্ডে যাওয়ার অনুমতি পান এবং ৮ ডিসেম্বর থেকে ছুটি ভোগ শুরু করেন। তবে নির্ধারিত সময় শেষে তিনি কর্মস্থলে যোগদান করেননি। দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার পর ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এনবিআর তার কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়।

জবাবে তিনি ই-মেইলের মাধ্যমে দাবি করেন, তিনি আগেই ছুটির মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানায়, আবেদনটি সরকারি বিধি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী করা হয়নি। ফলে ২০২৫ সালের ৪ মার্চ তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাকে দ্রুত কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরও তিনি দেশে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণ করেননি।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া ৬০ দিনের বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকাকে গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই বিধিমালার আওতায় তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ এনে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি লিখিত জবাব না দেওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

এনবিআরের সদস্য ড. মোহা. আল আমিন প্রামাণিক তদন্তের দায়িত্ব পালন করেন। তদন্ত শেষে তার প্রতিবেদনে তানজিনা রইসের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও সাত কার্যদিবসের মধ্যেও তিনি কোনো ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের জবাব দেননি।

এরপর এনবিআর চাকরি থেকে বরখাস্তের সুপারিশ করে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের কাছে পাঠায়। পিএসসি তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পর চূড়ান্তভাবে তাকে সরকারি চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়।

এনবিআরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তানজিনা রইস বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি অতীতে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম)-এ যুগ্ম কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালের শেষ দিকে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি ইউনিভার্সিটিতে ‘মাস্টার্স অব কমার্স উইথ এ স্পেশালাইজড ইন ফাইন্যান্স’ কোর্সে অধ্যয়নের জন্য সরকারি শিক্ষা ছুটি পান। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তাকে শিক্ষা ছুটি দেওয়া হয়েছিল। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি দেশে ফিরে পুনরায় সরকারি দায়িত্বে যোগ দেন।

পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সন্তানের চিকিৎসার জন্য তাকে ১৫ দিনের ছুটি দিয়ে থাইল্যান্ডে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে না এসে তিনি অনুমতি ছাড়াই অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। পরবর্তীতে নির্ধারিত ছুটির মেয়াদ শেষ হলেও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি কিংবা বিধি অনুযায়ী ছুটি বাড়ানোর অনুমোদনও নেননি।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এ ধরনের ঘটনায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তানজিনা রইসের ক্ষেত্রেও সেই বিধান অনুসরণ করেই তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে বিধিবদ্ধ নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাজস্ব প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা বা অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ অনুপস্থিতি সরকারি সেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি প্রশাসনে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তানজিনা রইস বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে তার ব্যক্তিগত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি। এনবিআরের প্রজ্ঞাপনে কেবল সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ভিত্তিতেই চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত