প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতীয় চলচ্চিত্র থ্রি ইডিয়টস মুক্তির প্রায় দেড় দশক পর আবারও আলোচনায় এসেছে সিনেমাটির অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র ‘র্যাঞ্চো’ বা ‘ফুংসুখ ওয়াংড়ু’। দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদের একটি বড় অংশের বিশ্বাস ছিল, চরিত্রটি লাদাখের প্রকৌশলী, উদ্ভাবক ও শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুকের জীবন ও কাজ থেকে অনুপ্রাণিত। তবে এবার সেই ধারণাকে স্পষ্টভাবে ভুল বলে জানিয়েছেন বলিউড সুপারস্টার আমির খান।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত ১৭তম লন্ডন ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমির বলেন, থ্রি ইডিয়টস নির্মাণের সময় তিনি কিংবা চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্যকাররা কেউই সোনম ওয়াংচুক সম্পর্কে জানতেন না। তার ভাষায়, র্যাঞ্চো চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুকের জীবনী থেকে নেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
আমিরের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন সোনম ওয়াংচুক ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশ্নফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসার পেছনে আরও একটি কারণ ছিল থ্রি ইডিয়টস-এ ‘চতুর’ চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা ওমি বৈদ্যের একটি ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সেই ভিডিওতে তিনি দাবি করেছিলেন, র্যাঞ্চো চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুকের জীবন থেকেই অনুপ্রাণিত।
লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সমাপনী অনুষ্ঠানে এক দর্শক প্রশ্ন করেন, থ্রি ইডিয়টস তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তিনি জানেন, সিনেমাটির গল্প সোনম ওয়াংচুকের জীবন থেকে নেওয়া। জবাবে আমির খান বলেন, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। তিনি বলেন, যখন সিনেমাটি তৈরি হচ্ছিল, তখন নির্মাতারা সোনম ওয়াংচুককে চিনতেন না। চলচ্চিত্র মুক্তির পর যখন এই আলোচনা শুরু হয়, তখন সোনম নিজেও বিষয়টি পরিষ্কার করেছিলেন।
আমির আরও বলেন, অভিনেতা ওমি বৈদ্যের বক্তব্যও সঠিক নয়। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই মন্তব্য বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি জানান, সিনেমাটির চিত্রনাট্য রচনার সময় কোনো পর্যায়েই সোনম ওয়াংচুকের জীবন বা কর্মকাণ্ডকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি।
তবে এই বিতর্ক একেবারে নতুন নয়। থ্রি ইডিয়টস মুক্তির পর থেকেই অনেক দর্শক র্যাঞ্চো চরিত্রের সঙ্গে সোনম ওয়াংচুকের মিল খুঁজে পান। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, সৃজনশীল শিক্ষা এবং লাদাখে তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা উদ্যোগের কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন, সিনেমার চরিত্রটি তার বাস্তব জীবনের প্রতিফলন।
এ বিষয়ে কয়েক বছর আগে নিজের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেছিলেন সোনম ওয়াংচুক। তিনি জানিয়েছিলেন, চলচ্চিত্রটির নির্মাতারা কখনো তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি কিংবা তার কাছ থেকে কোনো অনুমতিও নেননি। তবে তিনি এটাও বলেন, শুরুতে এ নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি করেননি, কারণ তাতে ভুল বার্তা যেতে পারত।
ওয়াংচুকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে থ্রি ইডিয়টস মুক্তির আগে একটি অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমির খানের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেই সময় তিনি আমিরকে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের সিয়াচেন অঞ্চল নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেছিলেন, সীমান্তে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে সেই অর্থ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হলে সমাজের জন্য আরও ইতিবাচক ফল আসতে পারে। তার দাবি, আমির তখন আগ্রহ নিয়ে পুরো বিষয়টি শুনেছিলেন।
পরে ওয়াংচুক ফ্রান্সে চলে যান। পরের বছর থ্রি ইডিয়টস মুক্তির পর দর্শকরা তার সঙ্গে র্যাঞ্চো চরিত্রের মিল খুঁজতে শুরু করেন। তবে তিনি তখনও প্রকাশ্যে কোনো অভিযোগ করেননি। তার মতে, কাহিনির স্বত্ব নিয়ে আইনি দাবি করার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর তিনি নির্মাতাদের কাছে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে আমিরের সঙ্গে তার আগের সাক্ষাতের বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। তবে সেই চিঠির কোনো উত্তর তিনি পাননি এবং উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশাও করেননি।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, থ্রি ইডিয়টস মূলত ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মুখস্থনির্ভর সংস্কৃতির সমালোচনা এবং সৃজনশীল শিক্ষার পক্ষে একটি শক্তিশালী বক্তব্য তুলে ধরেছিল। তাই র্যাঞ্চো চরিত্রকে বাস্তব কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে নির্মাতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চরিত্রটি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি।
২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রাজকুমার হিরানি পরিচালিত থ্রি ইডিয়টস ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সফল চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। আমির খান, আর. মাধবন, শারম্যান জোশি, কারিনা কাপুর এবং বোমান ইরানি অভিনীত সিনেমাটি শুধু বক্স অফিসেই নয়, দর্শক ও সমালোচকদের কাছেও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। শিক্ষাব্যবস্থা, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত স্বপ্ন অনুসরণের বার্তার কারণে চলচ্চিত্রটি এখনও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়।
আমির খানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর বহুদিনের এই বিতর্ক আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও র্যাঞ্চো চরিত্রের সঙ্গে সোনম ওয়াংচুকের দর্শনগত মিল নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে, তবে চলচ্চিত্রটির নির্মাতারা যে চরিত্রটি সরাসরি তার জীবনী থেকে তৈরি করেননি, সে অবস্থান এবার স্পষ্টভাবেই তুলে ধরেছেন আমির খান।