প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে ঢাকা পড়েছে দেশ। ভোরের আলো ফুটতেই চারপাশে ঝরে পড়ে গুড়ি গুড়ি কুয়াশা, দিনের বেলাতেও রোদের দেখা মেলে না অনেক সময়। এমন হাড় কাঁপানো শীতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অনেক অভ্যাসেই আসে পরিবর্তন। তার মধ্যে অন্যতম হলো গোসল। শীত এলেই অনেকেই নিয়মিত গোসলের অভ্যাসে ছেদ টানেন, কেউ কেউ আবার কয়েক দিন পরপর গোসল করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শীতে গোসল না করলে বা অনিয়মিত গোসল করলে শরীরের জন্য সেটি কতটা নিরাপদ? আর যদি গোসল করতেই হয়, তবে শীতের আদর্শ সময় কখন—এই প্রশ্নের উত্তর জানাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে প্রতিদিন গোসল করতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অতিরিক্ত ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী দুই থেকে তিন দিন পরপর গোসল করলেও তাতে বড় কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। তবে দীর্ঘ সময় গোসল না করলে শরীরে ধুলোবালি, ঘাম ও ময়লা জমতে থাকে। এর ফলে ত্বকে সংক্রমণ, চুলকানি কিংবা দুর্গন্ধের সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ঠান্ডা, জ্বর, সর্দি, পেটের গোলযোগসহ নানা অসুখের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই শীতের কারণে গোসল একেবারে বাদ না দিয়ে সঠিক সময় ও নিয়ম মেনে গোসল করাই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বোল্ড স্কাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, শীতের সময়ে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে গোসল করা শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। শীতের সকালে শরীরের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। হঠাৎ ঠান্ডা পানি বা এমনকি কুসুম গরম পানির সংস্পর্শে এলেও শরীরে শক লাগার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, বাতব্যথা কিংবা শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শীতকালে ঘুম থেকে উঠেই কোনো কাজ তড়িঘড়ি শুরু না করাই ভালো। ঘুম ভাঙার পর অন্তত পাঁচ মিনিট বিছানায় বসে শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে দিতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এই অভ্যাস শরীরের রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে এবং হঠাৎ ঠান্ডাজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি কমায়।
শীতে গোসলের আদর্শ সময় নিয়ে চিকিৎসকদের মতামত বেশ পরিষ্কার। তাঁদের মতে, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যেই গোসল করা সবচেয়ে নিরাপদ ও উপযোগী। এই সময়টায় দিনের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি থাকে। ভোরের তীব্র ঠান্ডা কিংবা বিকেলের কনকনে হাওয়ার প্রভাব তখন কম থাকে। ফলে শরীর হঠাৎ ঠান্ডায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়। যারা নিয়মিত গোসল করেন কিংবা দীর্ঘ বিরতির পর গোসল করতে চান, তাদের জন্য এই সময়টাই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে করা হচ্ছে।
শীতে গোসলের সময় শুধু সময় নির্বাচন করলেই যথেষ্ট নয়, কিছু স্বাস্থ্যকর নিয়ম মেনে চলাও জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের ঠান্ডা আবহাওয়ায় পানির স্বাভাবিক তাপমাত্রা অনেকটাই কমে যায়। তাই সরাসরি ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল না করে গরম পানির সঙ্গে ঠান্ডা পানি মিশিয়ে কুসুম গরম করে নেওয়াই উত্তম। এতে শরীরের তাপমাত্রার সঙ্গে পানির তাপমাত্রার পার্থক্য কম থাকে এবং হঠাৎ ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি হ্রাস পায়।
গোসলের সময় সাবান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শীতে একটু সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত সাবান ব্যবহারে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হয়ে যায়, ফলে শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ত্বক আরও বেশি রুক্ষ ও খসখসে হয়ে ওঠে। তাই চিকিৎসকরা শীতে সাবানের পরিবর্তে মৃদু শাওয়ার জেল বা ময়েশ্চারাইজিং ক্লিনজার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে ত্বক পরিষ্কার থাকবে, আবার অতিরিক্ত শুষ্কও হবে না।
গোসলের পরপরই ত্বকের যত্ন নেওয়াটা শীতকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গোসল শেষে শরীর ভালোভাবে মুছে নিয়ে অলিভ অয়েল, নারকেল তেল কিংবা ভালো মানের বডি লোশন ত্বকে মালিশ করলে ত্বক আর্দ্র থাকে এবং শুষ্কতা ও চুলকানির সমস্যা কমে। বিশেষ করে যাদের ত্বক খুব শুষ্ক, তাদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস শীতে আরামদায়ক অনুভূতি এনে দেয়।
যাদের সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা কিংবা বাতের ব্যথার সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য শীতে গোসলের সময় আরও সতর্কতা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সব সময় কুসুম গরম পানি ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এতে শরীর আরাম পায় এবং ঠান্ডাজনিত উপসর্গ বাড়ার আশঙ্কা কমে।
অনেক সময় শীতের তীব্রতায় তিন দিন পরপর গোসল করাও সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে পুরো শরীর পরিষ্কার রাখা একেবারে বাদ দেওয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি গোসল করা সম্ভব না হয়, তবে ভেজা তোয়ালে বা হালকা গরম পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে শরীর ভালোভাবে মুছে নেওয়া যেতে পারে। এতে ঘাম ও ময়লা দূর হবে এবং শরীরের পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতে গোসল নিয়ে অতিরিক্ত ভয় বা অবহেলা—দুটোই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। শীতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সঠিক সময় ও নিয়ম মেনে গোসল করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এতে একদিকে যেমন শরীর পরিষ্কার ও সতেজ থাকে, অন্যদিকে ঠান্ডাজনিত নানা রোগের ঝুঁকিও কমে আসে।
এই প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদন অনুসন্ধান করে এবং অনলাইন তথ্য-উপাত্ত বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে শীতকালে গোসলের আদর্শ সময় ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তুলে ধরা হয়েছে, যাতে পাঠক নিজের দৈনন্দিন জীবনে সহজেই তা প্রয়োগ করতে পারেন।
শীতের সকালে কিংবা দুপুরে গোসল—যে সময়ই বেছে নিন না কেন, শরীরের সংকেত বুঝে এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মেনে চললেই শীতকাল কাটবে সুস্থ ও স্বস্তিতে।