ঈশ্বরদীতে নামল শীতের রেকর্ড, কাঁপছে উত্তরাঞ্চল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭০ বার
৭৩ বছরে নজিরবিহীন শীত, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কাঁপছে দেশ

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ায় উত্তরাঞ্চলজুড়ে শীতের তীব্রতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সোমবার সকাল ৯টায় ঈশ্বরদীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা এদিন দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়া পর্যবেক্ষক নাজমুল হক রঞ্জন এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, মৃদু শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে উত্তরের ঠান্ডা বাতাস যুক্ত হওয়ায় তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাচ্ছে এবং শীতের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে।

আবহাওয়া অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঈশ্বরদীতে গত কয়েকদিন ধরেই তাপমাত্রার ধারাবাহিক নিম্নগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রোববার এখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, শনিবার ৯ ডিগ্রি এবং শুক্রবার তা নেমে আসে ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সোমবারের ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা চলতি শীত মৌসুমে ঈশ্বরদীর পাশাপাশি দেশের সার্বিক চিত্রেও উল্লেখযোগ্য একটি রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শীতের এই তীব্রতা সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। ভোর থেকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে চারপাশ। অনেক এলাকায় সকাল গড়িয়ে গেলেও সূর্যের দেখা মিলছে না। কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় সড়ক ও নৌপথে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষ, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক ও রিকশাচালকদের কাজে বের হতে দেরি হচ্ছে, আবার কেউ কেউ শীতের কারণে কাজেই যেতে পারছেন না। এতে তাদের দৈনন্দিন আয় মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে।

ঈশ্বরদীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সকালে কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইছে। দুপুরের দিকে কুয়াশা কিছুটা কেটে গেলেও সূর্যের তেজ না থাকায় শরীর গরম হওয়ার সুযোগ মিলছে না। সন্ধ্যার পর আবারও ঠান্ডা বাড়ছে, যা শিশু ও বয়স্কদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। স্থানীয় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং এর প্রভাব আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। উত্তরের হিমেল বাতাসের প্রবাহ অব্যাহত থাকলে তাপমাত্রা আরও কমার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না আবহাওয়াবিদরা। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা আরও নিচে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে জানুয়ারি মাসের শুরুতেই উত্তরাঞ্চলে শীতের প্রকোপ আরও তীব্র রূপ নিতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দুঃস্থ ও অসহায় মানুষজন। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষ, নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বাসিন্দারা শীতের সঙ্গে কার্যত লড়াই করে বেঁচে আছেন। অনেকেরই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই। ঠান্ডা মেঝে বা খোলা স্থানে রাত কাটাতে গিয়ে তারা নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে।

এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুর রহমান জানান, সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ৩ হাজার ১০০টি কম্বল দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, শীতের তীব্রতা বিবেচনায় নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে শীতে কোনো মানুষকে অমানবিক কষ্ট পেতে না হয়।

স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নিজস্ব উদ্যোগে কম্বল, শীতবস্ত্র ও গরম কাপড় বিতরণ করা হচ্ছে। তবে শীত যত বাড়ছে, প্রয়োজনও তত বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, শুধুমাত্র কম্বল নয়, দীর্ঘস্থায়ী শীত মোকাবিলায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতের এই সময়টাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সবাইকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। শিশু ও বয়স্কদের উষ্ণ রাখতে বিশেষ নজর দেওয়ার পাশাপাশি খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষদের জন্য গরম পোশাক নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ঘন কুয়াশার কারণে যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

ঈশ্বরদীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি জেলার খবর নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক শীত পরিস্থিতিরই প্রতিচ্ছবি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীতের ধরন বদলাচ্ছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। কখনো হঠাৎ তীব্র শীত, আবার কখনো তুলনামূলক উষ্ণতা—এই চরমতার মধ্যেই দেশবাসীকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে ঈশ্বরদীতে তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসা উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন করে শীতের বার্তা নিয়ে এসেছে। সামনে আরও কয়েকদিন এই শীত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস থাকায় জনজীবনে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তাই শীত মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষের এগিয়ে আসাও এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত