প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার বাতাস যেন আর কেবল শ্বাস নেওয়ার উপযোগী নয়, ক্রমেই তা হয়ে উঠছে নীরব ঘাতক। প্রতিবছর শীত এলেই রাজধানীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ে—এ দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু এবার শীত পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই ঢাকার বাতাসে দূষণের ভয়াবহ রূপ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ থেকে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে উঠে গেছে বায়ুর মান। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নগরবাসীর স্বাস্থ্যে, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা।
বাতাসে ভাসমান অতিক্ষুদ্র বিষাক্ত কণা, বিশেষ করে পিএম২.৫ ও পিএম১০-এর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের শ্বাসতন্ত্র মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, যেসব শিশু আগে কখনও শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানির সমস্যায় ভোগেনি, তারাও এখন নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে। খেলাধুলা বা স্কুলে যাতায়াতের সময় দূষিত বাতাস তাদের ফুসফুসে ঢুকে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সমস্যা সহজে সেরে উঠছেও না।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিনই বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। হাসপাতালের বহির্বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. লুনা পারভীন জানান, ধুলাবালি ও দূষিত বাতাসের কারণে শিশুদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বাইরে খেলাধুলা করলেই তাদের সমস্যা বাড়ছে। তিনি বলেন, বংশগতভাবে হাঁপানি না থাকলেও অনেক শিশুর মধ্যে নতুন করে শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। এসব শিশু সহজে সুস্থ হচ্ছে না, দীর্ঘদিন চিকিৎসার আওতায় থাকতে হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুদূষণের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে ইটভাটার ধোঁয়া, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং শিল্পকারখানার নির্গমন অন্যতম। পাশাপাশি শীত মৌসুমে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত বাতাসের সঙ্গে ভারতের হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি, পাঞ্জাব, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের দূষিত বাতাসও বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার গড় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই ছিল প্রায় ২০০। যদিও এটি বিগত ১১ বছরের ডিসেম্বর মাসের গড় ২০৫-এর তুলনায় সামান্য কম, তবুও এই মাত্রা স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, একিউআই ১৫০ ছাড়ালেই সেটিকে অস্বাস্থ্যকর ধরা হয়, যেখানে ঢাকার অবস্থান অনেক দিন ধরেই তার ঊর্ধ্বে।
বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামারুজ্জামান মজুমদার জানান, গত নয় বছরে ঢাকাবাসী মাত্র ৫০ দিন নির্মল বায়ু পেয়েছে। তাঁর ভাষায়, ঢাকার দূষণের অবস্থা বোঝার জন্য আধুনিক যন্ত্রেরও প্রয়োজন পড়ে না, খালি চোখেই তা দেখা যায়। রাস্তায় বেরোলেই দেখা যায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন কীভাবে কালো ধোঁয়া ছেড়ে পরিবেশ দূষণ করছে। নির্মাণকাজের ধুলা আর ইটভাটার ধোঁয়া মিলিয়ে পুরো শহর যেন ধোঁয়ার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দূষণ কেবল মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে না, এটি শহরের গাছপালা, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের স্বাভাবিক সৌন্দর্যও ধ্বংস করছে। পাতায় জমে থাকা ধুলাবালি গাছের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে, কমে যাচ্ছে সবুজের প্রাণশক্তি। অথচ এসব ক্ষতির কথা জানা থাকার পরও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।
ঢাকার বায়ুদূষণে শীর্ষে থাকার পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন পরিবেশবিদরা। অতিরিক্ত যানবাহন, পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাব, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও ইটভাটার বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শীত মৌসুমে বৃষ্টি কম হওয়ায় বাতাসে জমে থাকা ধুলাবালি সহজে পরিষ্কার হয় না, ফলে দূষণের মাত্রা দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকে।
পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক স্বীকার করেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে দূষিত বাতাস প্রবেশ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা দূষিত বাতাস শীতকালে ঢাকার বায়ুদূষণকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন। তবে তিনি জানান, দেশীয় উৎস থেকে সৃষ্ট দূষণ কমাতে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে এবং ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়া এবং অকাল মৃত্যুর আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি।
সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত নীতিমালার ওপর জোর দিচ্ছেন। কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ, ইটভাটায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করা, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে, যাতে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, ঢাকার বাতাস এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। এই সংকটের সবচেয়ে নীরব ও অসহায় শিকার শিশুরা। তাদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।