সর্বশেষ :
গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও দূরত্ব ঘোচেনি ড্রোন অনুপ্রবেশে দোষীদের শাস্তির অঙ্গীকার দক্ষিণ কোরিয়ার ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের দাবি ব্রিটিশ এমপিদের বিবাহবার্ষিকীতে ডিভোর্স পেপার, সেলিনার জীবনের কঠিন সত্য উত্তেজনার মধ্যে ইরানের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ হাদীর বিচার চাই: ইনকিলাব মঞ্চ নিয়ে স্ত্রীর প্রশ্ন ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নে ধস, উন্নয়ন গতি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন রংপুরের ছয় আসনে ভোটের লড়াই, শক্ত অবস্থানে জামায়াত যুব বিশ্বকাপে আজ পর্দা উঠছে, শুরুতেই ভারতের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে, দাবি ট্রাম্পের

ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রির ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৯ বার
ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রির ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ তিন দশক পর দেশের স্বাস্থ্যখাতে এক গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অত্যাবশ্যক ওষুধের নতুন তালিকা প্রণয়ন ও এসব ওষুধের দাম নির্ধারণের মাধ্যমে সরকার সরাসরি মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং ওষুধের ন্যায্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পথে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে কোনোভাবেই অত্যাবশ্যক ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ে স্বস্তি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জাতীয় অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত গাইডলাইনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন তালিকায় মোট ২৯৫টি ওষুধকে অত্যাবশ্যক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে আগে থেকেই থাকা ১১৭টি ওষুধের পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও ওষুধ বিক্রেতাদের এসব অত্যাবশ্যক ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ফার্মেসি এই দামের বাইরে গিয়ে ওষুধ বিক্রি করতে পারবে না। একই সঙ্গে দাম সমন্বয়ের জন্য একটি সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে শিল্পখাত ও বাজার ব্যবস্থাপনায় হঠাৎ কোনো ধাক্কা না লাগে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ও বাজারে প্রচলিত ওষুধের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারের কাছাকাছি। অথচ সর্বশেষ ৩০ বছর আগে, যখন দেশে মোট ওষুধের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫০টি, তখন ১১৭টি ওষুধকে অত্যাবশ্যক হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন করে তালিকা হালনাগাদ বা মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ওষুধের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি, যার প্রভাব পড়েছে সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে।

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অত্যাবশ্যক ওষুধের নতুন তালিকা প্রণয়ন ও মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়। প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদাসম্পন্ন অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো দেশের মানুষের জন্য ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য খাতে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানো। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের ফলে সাধারণ মানুষ তুলনামূলকভাবে কম দামে অত্যাবশ্যক ওষুধ কিনতে পারবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

তিনি সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের ওষুধ নীতির অতীত প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি ছিল বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি মাইলফলক। এই নীতির মাধ্যমে দেশীয় ওষুধ শিল্প শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায় এবং সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধ সহজলভ্য হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে এসে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র সংকুচিত করে এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা হয়। তখন বাজারে প্রায় ৩৫০টি ওষুধের মধ্যে ১১৭টির দাম নিয়ন্ত্রিত ছিল। এরপর দীর্ঘ সময় এই কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ওষুধের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়।

অধ্যাপক সায়েদুর রহমান আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে মানুষের মোট ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই চলে যায় ওষুধ কিনতে, আর এই ব্যয়ের বড় অংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই সরকার অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ ও মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি জানান, এই তালিকা প্রণয়নের জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। পরে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের জন্য আলাদা করে বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করে। এই টাস্কফোর্স ও কমিটি ওষুধ শিল্পের উৎপাদক, বিপণনকারী, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং আইসিডিডিআরবি-সহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করে সুপারিশ তৈরি করেছে। সরকারের দাবি, সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ওষুধের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, প্রচলিতভাবে কাঁচামাল বা এপিআই ও এক্সিপিয়েন্টের সঙ্গে একটি যৌক্তিক মার্কআপ নির্ধারণ করে অত্যাবশ্যক ওষুধগুলোর দাম ঠিক করা হবে। যারা বর্তমানে এর চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করছেন, তাদের ধাপে ধাপে নির্ধারিত দামে আসতে হবে। এই প্রক্রিয়াকে সহজ ও বাস্তবসম্মত করতে চার বছরের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ২৫ শতাংশ করে দাম সমন্বয় করা হবে, যাতে শিল্পখাতের ওপর হঠাৎ চাপ না পড়ে।

ওষুধ শিল্পের ওপর এই সিদ্ধান্তের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার শুরু থেকেই এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিল। দেশের ওষুধ শিল্প যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ যেন সুফল পায়—এই ভারসাম্য বজায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই নীতিই দেশের ওষুধ শিল্পকে আরও টেকসই ও দায়িত্বশীল করে তুলবে।

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৈষম্য কমবে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ ৩০ বছর পর অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা হালনাগাদ ও মূল্য নির্ধারণের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামে ওষুধ বিক্রির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবায় ন্যায্যতা ও সমতা নিশ্চিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত