প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়ালেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে ‘বড় ধরনের বিপদে’ রয়েছে বলে সতর্ক করে দিয়ে তিনি সরাসরি সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছে।
শুক্রবার এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরান এমন এক সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। তার ভাষায়, “ইরান বড় বিপদে আছে। আমার মনে হচ্ছে জনগণ এমন কিছু শহর দখল করছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও কেউ কল্পনা করেনি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও গভীরতার দিকটি তুলে ধরেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ জমছিল দীর্ঘদিন ধরেই। সাম্প্রতিক সময়ে সেই ক্ষোভ রূপ নিয়েছে সহিংস বিক্ষোভে। অনেক জায়গায় সরকারি ভবন, নিরাপত্তা চৌকি ও প্রশাসনিক স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি ইরান সরকারকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, বিক্ষোভ দমনে যদি সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানো শুরু করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে। ট্রাম্পের ভাষায়, “আপনারা গুলি চালানো শুরু না করলেই ভালো হবে, কারণ তাহলে আমরাও গুলি চালাবো।” এই মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক সামরিক হস্তক্ষেপের প্রকাশ্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
এর আগেও ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। গত সপ্তাহে তিনি তেহরানকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে ইরানের বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। যদিও তিনি স্পষ্ট করে সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেননি, তবে তার বক্তব্যে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট।
ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি ইরানের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার কথায়, “আমি আশা করি ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকবে, কারণ এটি এখন খুবই বিপজ্জনক একটি জায়গা।” এই বক্তব্যে একদিকে মানবিক উদ্বেগ প্রকাশ পেলেও অন্যদিকে তা ইরান সরকারের জন্য একটি কড়া রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকেও কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে। শুক্রবার দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি চলমান বিক্ষোভকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, এর পেছনে বিদেশি শক্তির চক্রান্ত রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি এই অস্থিরতার প্রধান মদদদাতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
খামেনির ভাষায়, ইরানের শত্রুরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির স্থিতিশীলতা নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, “বিদেশি শত্রুরা আমাদের জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। কিন্তু ইরানের জনগণ সবসময় তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।” বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
ইরানের সরকারি গণমাধ্যমগুলোও ট্রাম্পের বক্তব্যকে উসকানিমূলক এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এ ধরনের মন্তব্য ও হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে। ইরান সরকার বারবার বলে আসছে, দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা তারা নিজেরাই মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই কথার লড়াই কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে। ইতোমধ্যে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি সেই উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানে চলমান বিক্ষোভ মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ফল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর দেশের প্রকাশ্য হুমকি পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে পারে। এতে একদিকে ইরান সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের মাত্রাও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া মানে বিশ্ববাসীর চোখের আড়ালে সহিংসতা চালানোর সুযোগ তৈরি করা। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকেও ট্রাম্পের এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, নির্বাচনী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প আবারও কড়া পররাষ্ট্রনীতির বার্তা দিতে চাইছেন। ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থান তার সমর্থকদের কাছে বরাবরই জনপ্রিয়। ফলে এই ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে জনগণের ক্ষোভ ও আন্দোলন, অন্যদিকে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হুমকি—সব মিলিয়ে দেশটি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, তা শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।