চুয়াডাঙ্গা ও তেঁতুলিয়ায় কনকনে শীত, সর্বনিম্ন ৮.৩ ডিগ্রি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯ বার
দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গা

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ওপর জেঁকে বসেছে শীতের তীব্রতা। উত্তরের হিমেল হাওয়ার সঙ্গে ঘন কুয়াশা আর টানা শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। শনিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গা ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এদিন সকাল ৯টায় উভয় স্থানে তাপমাত্রা নেমে আসে ৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা সারাদেশের মধ্যে সর্বনিম্ন।

চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জামান জানান, শনিবার সকাল ৬টায় চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ। তিন ঘণ্টা পর সকাল ৯টায় তাপমাত্রা আরও কমে ৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে এবং বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৩ শতাংশ। একই সময়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়াতেও সমান তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে কয়েক দিন ধরেই টানা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কখনো মৃদু, কখনো মাঝারি মাত্রার এই শৈত্যপ্রবাহ জেলার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে। রাত গভীর হলেই কুয়াশা নেমে আসে। ভোর থেকে সকাল আটটা বা তারও বেশি সময় চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকে। কুয়াশার কারণে সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জায়গায় কয়েক হাত দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কনকনে ঠান্ডা আর হিমেল বাতাসে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষরা। দিনমজুর, ভ্যানচালক, রিকশাচালক ও কৃষিশ্রমিকদের কাজ কমে গেছে। ভোরের দিকে কাজে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে আয়-রোজগারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। শীতের প্রকোপে অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।

গত শুক্রবার চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের বুধবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়, যখন তাপমাত্রা নেমে আসে ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ওই দিন জেলার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। স্কুলগামী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ সবাই শীতের তীব্রতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।

শুধু চুয়াডাঙ্গা নয়, উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়াতেও একই চিত্র। তেঁতুলিয়া বরাবরই দেশের শীতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। শীত মৌসুমে প্রায় প্রতিবছরই এখানকার তাপমাত্রা দেশের সর্বনিম্নে নেমে আসে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শনিবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত তেঁতুলিয়া ছিল ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। সূর্যের দেখা মেলেনি অনেক দেরিতে।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, শৈত্যপ্রবাহের কারণে বোরো বীজতলা ও সবজি ক্ষেতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে আলু, টমেটো ও শীতকালীন সবজি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ অবশ্য পরামর্শ দিয়েছে, প্রয়োজনে সেচ ও অন্যান্য পরিচর্যা বাড়াতে।

শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিশু ও বয়স্করা। শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে রোগীর চাপ বাড়ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই সময়ে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। উষ্ণ কাপড় ব্যবহার এবং ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা শহরের এক বাসিন্দা বলেন, “রাতে এত ঠান্ডা যে ঘুমানো কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। ভোরে কুয়াশার মধ্যে বাইরে বের হওয়া যায় না। আগুন জ্বালিয়েও শরীর গরম রাখা কঠিন।” তার মতো অনেকেই খোলা জায়গায় খড়কুটো বা কাঠ জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।

এদিকে কুয়াশার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। ভোরের দিকে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে যানবাহন চলাচল খুব ধীরগতিতে হচ্ছে। অনেক চালক হেডলাইট জ্বালিয়েও সামনে ঠিকমতো দেখতে পারছেন না। পুলিশ ও হাইওয়ে কর্তৃপক্ষ চালকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। রাতের তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমার আশঙ্কা রয়েছে। দিনের বেলায় সূর্যের দেখা মিললেও কুয়াশার কারণে তাপমাত্রা খুব একটা বাড়ছে না। ফলে সারাদিনই ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় ঠান্ডার অনুভূতি আরও তীব্র হচ্ছে। আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীর থেকে তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়, ফলে মানুষ বেশি শীত অনুভব করে। চুয়াডাঙ্গা ও তেঁতুলিয়ায় শনিবার সকালে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা শীতের প্রকোপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শীতার্ত মানুষের জন্য কম্বল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শীতের তীব্রতার তুলনায় এই সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষরা সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালীন এই তীব্রতা জলবায়ু পরিবর্তনের একটি প্রভাব হিসেবেও দেখা যেতে পারে। শীত ও গ্রীষ্ম—উভয় মৌসুমেই চরম আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে কৃষি, স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে।

সব মিলিয়ে, চুয়াডাঙ্গা ও তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার মধ্য দিয়ে শীতের এই দাপট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কনকনে ঠান্ডা, ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত জনজীবন এখন তাকিয়ে আছে একটু উষ্ণতার আশায়। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে, সে অপেক্ষায় পুরো উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত