প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভদ্রতা ও সম্বোধনের ভাষা নিয়ে যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত, তার ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার রাজধানীর বনানী শেরাটন হোটেলে সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় অনুরোধ জানান—তার নামের আগে যেন “মাননীয়” শব্দটি ব্যবহার না করা হয়। বক্তব্যের সংক্ষিপ্ততা যতটা না ছিল, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য তার চেয়েও বেশি; ক্ষমতা, নেতৃত্ব ও জনসম্পর্কে তিনি কোন অবস্থান থেকে কথা বলতে চান, সে বার্তাই যেন তুলে ধরলেন।
অনুষ্ঠানে ঢাকার একজন সাংবাদিকনেতা বক্তব্যে তারেক রহমানকে ‘মাননীয়’ বলে সম্বোধন করলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “দয়া করে আমার নামের আগে মাননীয় সম্বোধন করবেন না।” তার এই অনুরোধকে অনেকেই ব্যক্তিগত বিনয় হিসেবে দেখলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল সৌজন্য নয়; বরং নেতৃত্বের ধরন, দলের সাংস্কৃতিক রূপান্তর এবং গণতান্ত্রিক পরিসরে সম্পর্কের ভাষা নিয়ে একটি সচেতন বার্তা।
এই মতবিনিময় সভাটি আয়োজন করা হয় দেশের সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদকদের সঙ্গে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি, গণতন্ত্রের পথচলা, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এবং চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে তারেক রহমান সরাসরি সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তার সঙ্গে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে যে পরিবেশ তৈরি হয়, তা সভার শুরুতেই একটি আলাদা মাত্রা এনে দেয়।
তারেক রহমান বক্তব্যে বলেন, “আমি দীর্ঘদিন দেশে থাকতে পারিনি, কিন্তু সারাক্ষণই মন দেশেই ছিল।” তার এই কথায় নির্বাসিত বা বিদেশে অবস্থানরত রাজনীতিকদের মানসিক টানাপোড়েনের প্রতিফলন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে দেশের রাজনীতির প্রতি তার দায়বদ্ধতার প্রকাশ। তিনি জানান, দূরত্ব কখনোই তাকে দেশের রাজনীতি ও জনগণের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের নেতাকর্মীদের সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাকে সবসময় ভাবিয়েছে।
‘মাননীয়’ সম্বোধন না করার অনুরোধটি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়—এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নও উত্থাপন করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ নেতাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা, উপাধি ও বিশেষণ ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। ক্ষমতা ও নেতৃত্বকে ঘিরে এই ভাষাগত আড়ম্বর অনেক সময় নাগরিকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। তারেক রহমানের অনুরোধ সেই প্রচলিত ধারা থেকে সরে এসে নেতৃত্বকে নাগরিক পরিসরের কাছাকাছি আনার একটি প্রয়াস বলেই অনেকেই মনে করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বের রূপান্তর, দলীয় কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং তরুণদের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা বলে আসছে। ‘মাননীয়’ শব্দ বর্জনের আহ্বান সেই বৃহত্তর বার্তার অংশ হতে পারে—যেখানে নেতা নিজেকে ক্ষমতার উচ্চাসনে নয়, বরং নাগরিকদের একজন হিসেবে দেখতে চান। এতে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও সম্পর্কের এক ধরনের সমতাভিত্তিক কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক।
সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক জানান, তারেক রহমানের অনুরোধে কোনো আড়ম্বর বা বিরক্তি ছিল না; বরং তা ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ ও দৃঢ়। তিনি স্পষ্ট করে বোঝাতে চেয়েছেন যে সম্বোধনের ভাষায় ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে উঁচুতে তুলে ধরার প্রয়োজন নেই। বরং মতবিনিময়, প্রশ্ন-উত্তর ও সমালোচনার জায়গায় স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সম্মানই হওয়া উচিত মূলনীতি।
এই সভায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মিডিয়ার সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেও নীতিনিষ্ঠতা, তথ্য যাচাই ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তারেক রহমান বলেন, মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু সেই অমিলের জায়গায় সংলাপ ও সমালোচনার স্বাধীনতাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে তার রাজনৈতিক জীবনপথের অভিজ্ঞতার ছাপও ছিল। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকা, দলীয় নেতৃত্বে রূপান্তর, বিরোধী রাজনীতির বাস্তবতা—সব মিলিয়ে তিনি একটি সংযত ও আত্মসমালোচনামুখর সুরে কথা বলেন। তার ভাষায়, “দেশের রাজনীতিতে আমাদের লক্ষ্য ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, জনগণের আস্থা অর্জন।” এই বক্তব্য তার ‘মাননীয়’ বর্জনের আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ—ক্ষমতার ভাষা নয়, নাগরিকতার ভাষায় রাজনীতি করার অঙ্গীকার।
রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি প্রতীকী হলেও বার্তাবহ; নেতৃত্বের সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আবার কেউ মনে করছেন, এটি জনসংযোগ কৌশলের অংশ—যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে উভয় মতের মাঝেই একটি বিষয় স্পষ্ট: সম্বোধনের ভাষা নিয়ে এই বক্তব্য রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সমর্থকরা এটিকে তারেক রহমানের বিনয় ও গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রমাণ হিসেবে দেখান। অনেকে মন্তব্য করেন, রাজনীতিতে নেতাদের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা ও উপাধি পরিহার করলে নাগরিক-নেতা সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক হতে পারে। আবার সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন, প্রতীকী বক্তব্যের বাইরে বাস্তব রাজনীতিতে এই মানসিকতার প্রতিফলন কতটা দেখা যাবে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিসরেও এই বক্তব্যের প্রভাব লক্ষণীয়। দলটির কয়েকজন নেতা বলেন, ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কমিয়ে নীতিকেন্দ্রিক রাজনীতির দিকে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সম্বোধনের ভাষায় পরিবর্তন হয়তো সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচনা। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে এমন খোলামেলা সম্পর্ক গড়ে তোলাও বিরোধী রাজনীতির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
সব মিলিয়ে, বনানীর সেই সভায় উচ্চারিত একটি সংক্ষিপ্ত অনুরোধ—“আমাকে মাননীয় বলবেন না”—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা ও নেতৃত্বের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এটি বিনয়ের প্রকাশ যেমন, তেমনি ক্ষমতার ভাষা থেকে নাগরিকতার ভাষায় যাওয়ার একটি সচেতন আহ্বানও। সামনে রাজনীতির মাঠে এই মনোভাব কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে অন্তত এই মুহূর্তে, সাংবাদিকদের উদ্দেশে তারেক রহমানের এই বার্তা রাজনৈতিক কথাবার্তায় ভিন্ন সুর যোগ করেছে—যেখানে সম্মান থাকবে, কিন্তু আড়ম্বর নয়; থাকবে নেতৃত্ব, কিন্তু নাগরিকদের ঊর্ধ্বে নয়।