দিনাজপুরে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা, জনজীবনে বাড়ছে দুর্ভোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৫ বার
দিনাজপুরে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা, জনজীবনে বাড়ছে দুর্ভোগ

প্রকাশ:   ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা দিনাজপুরে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। ঘন কুয়াশা, হিমেল হাওয়া ও নিম্ন তাপমাত্রার দাপটে কাঁপছে জনজীবন। প্রতিদিন ভোরের দিকে কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে জনপদ, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক, শিশু ও বয়স্করা। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে অনেক পরিবার মানবেতর দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় শীতের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। রোববার ভোর ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত অন্যতম নিম্ন তাপমাত্রা। একই সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ, ফলে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিতে শরীর জুড়ে শিরশিরে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে, বিশেষ করে ভোর ও রাতের দিকে শীতের দাপট আরও বাড়ছে।

ঘন কুয়াশার কারণে সকাল থেকে সড়ক ও মহাসড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় দৃশ্যমানতা নেমে এসেছে কয়েক মিটারের মধ্যে। এতে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহনের চালকরা পড়ছেন চরম ঝুঁকিতে। ধীরগতিতে চলাচল করায় বাড়ছে যাত্রাপথের সময়, কোথাও কোথাও দেখা দিচ্ছে যানজট। পথচারীদের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চাইছেন না।

শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে। দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, ইটভাটা ও কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। শীত ও কুয়াশার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে আয় কমে গিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করা এসব মানুষের কাছে শীত যেন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় তারা শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক চাপেও ভুগছেন।

শিশু ও বয়স্কদের জন্য শীত আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক গ্রামীণ পরিবারে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় গরম পোশাকের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, বাতব্যথা ও রক্তচাপজনিত সমস্যাও বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। শীতের রাতে কনকনে ঠান্ডা বাতাস বয়স্কদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

দিনাজপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহের কারণেই তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তার মতে, আগামী কয়েকদিন সকাল ও রাতের দিকে শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ঘন কুয়াশা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

শৈত্যপ্রবাহের কারণে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির মতো সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই মানুষ হাসপাতালে আসছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ঠান্ডা আবহাওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এসব রোগের প্রকোপ বাড়ে। তাই শীতকালে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, শীত থেকে বাঁচতে গরম ও মোটা পোশাক ব্যবহার, উষ্ণ খাবার গ্রহণ এবং শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ভোর ও রাতের দিকে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শীতজনিত কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

শীতের এই দুর্দিনে সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। স্থানীয়ভাবে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিত্তবান ব্যক্তি শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এখনও বহু মানুষ শীতবস্ত্রের বাইরে রয়ে গেছেন। মানবিক সহায়তা বাড়ানো না গেলে শীতজনিত দুর্ভোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

দিনাজপুরের কৃষিখাতেও শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব পড়ছে। ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে শীতকালীন ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। বিশেষ করে আলু, সরিষা ও সবজির ক্ষেতে সূর্যালোক কম পৌঁছানোয় ফলন কমে যেতে পারে বলে তারা উদ্বিগ্ন। কৃষকদের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

সব মিলিয়ে দিনাজপুরে চলমান শৈত্যপ্রবাহ শুধু একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়, এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শীতের এই কঠিন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে। অন্যথায় শীতের তীব্রতা আরও বাড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত