প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চুয়াডাঙ্গায় শীত যেন থামছেই না। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা মৃদু শৈত্যপ্রবাহ ক্রমেই জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সোমবার ভোর থেকে ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর তীব্র ঠান্ডায় চুয়াডাঙ্গার মানুষ কার্যত স্থবির অবস্থায় পড়েছে। আজ সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৪ শতাংশ, যা শীতের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
গত কয়েক দিন ধরেই চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রোববার জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার আগের দিন শনিবার তাপমাত্রা নেমেছিল ৮ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে। শুক্রবারও তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ টানা তিন দিনের বেশি সময় ধরে জেলায় তীব্র শীত বিরাজ করছে। যদিও রোববার সকালে সূর্য কিছুটা উঁকি দিয়েছিল, তবে সেই রোদে ছিল না কোনো উত্তাপ। উত্তরের হিমশীতল বাতাসে শীতের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
এই শীতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে। ভোরের আলো ফোটার আগেই যারা মাঠে নামেন, তাদের কষ্টের যেন শেষ নেই। কৃষিশ্রমিক চয়ন বলেন, “ভোরে মাঠে নামতে খুব কষ্ট হয়। ঠান্ডায় হাত ঠিকমতো চলে না। বাতাস থাকায় শীত আরো বেশি লাগে। কিন্তু কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে?” তার মতো অসংখ্য কৃষিশ্রমিক প্রতিদিন শীত উপেক্ষা করে মাঠে নামছেন ফসলের পরিচর্যায়।
আরেক দিনমজুর তুহিন জানান, সকাল বেলায় এত ঘন কুয়াশা থাকে যে কয়েক হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। তিনি বলেন, “তবুও কাজের সন্ধানে বের হতে হয়। কনকনে ঠান্ডায় কাজ করতে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তো পেটে ভাত জুটবে না।” এই কথাগুলোই যেন চুয়াডাঙ্গার শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
শীতের কারণে শুধু কৃষিশ্রমিক নয়, ভ্যানচালক, রিকশাচালক, ইটভাটার শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষও বিপাকে পড়েছেন। সকালবেলা রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল কমে গেছে। স্কুলগামী শিশুরা গরম কাপড়ে জড়িয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। অনেক পরিবারে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েছে, কারণ শীতজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের অবস্থা আরও করুণ। শীতের পোশাকের অভাবে অনেককে ভোর ও রাতে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করতে দেখা যাচ্ছে। শহরের বিভিন্ন মোড়, ফুটপাত ও খোলা জায়গায় খড়কুটো কিংবা কাঠ জ্বালিয়ে তারা শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। কনকনে ঠান্ডায় ছোট শিশুদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের দৃশ্য হৃদয়বিদারক।
চুয়াডাঙ্গার হাসপাতালগুলোতেও শীতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চিকিৎসকরা জানান, শীতজনিত রোগ যেমন সর্দি, কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার রোগী বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। তারা সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং গরম কাপড় ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, সোমবার ১২ জানুয়ারি সকাল ৯টায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯১ শতাংশ। এর তিন ঘণ্টা আগে সকাল ৬টায় তাপমাত্রা ছিল একই, অর্থাৎ ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তবে তখন আর্দ্রতা ছিল আরও বেশি, ৯৪ শতাংশ। তিনি বলেন, “এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে বর্তমানে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও উত্তরের ঠান্ডা বাতাসের কারণে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হচ্ছে।”
আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুয়াডাঙ্গা সাধারণত দেশের শীতপ্রবণ জেলা হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর শীত মৌসুমে এখানে তাপমাত্রা দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশি নেমে যায়। তবে চলতি মৌসুমে তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে ৮ ডিগ্রির আশপাশে থাকায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বিশেষ করে যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন বা বাস করেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
শীতের কারণে কৃষিখাতেও প্রভাব পড়ছে। অনেক কৃষক জানান, ভোরের কুয়াশা ও ঠান্ডায় মাঠে কাজের সময় কমে যাচ্ছে। কিছু সবজি ক্ষেতে রোগবালাইয়ের আশঙ্কাও দেখা দিচ্ছে। তবে আবার শীতকালীন সবজি চাষের জন্য এই আবহাওয়া কিছুটা সহায়ক বলেও মনে করছেন কৃষিবিদরা। তারা বলছেন, সঠিক পরিচর্যা করলে শীতকালীন ফসলের উৎপাদন ভালো হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গার সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন আবহাওয়ার উন্নতির দিকে। দিনের বেলায় সূর্যের উষ্ণতা বাড়লে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে বলে আশা করছেন তারা। তবে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আপাতত শীতের তীব্রতা কমার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। ফলে আগামী কয়েক দিন চুয়াডাঙ্গার মানুষকে এই কনকনে ঠান্ডার সঙ্গেই লড়াই করে চলতে হবে।
এই শীতে সামাজিক ও মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিত্তবানদের শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ দরিদ্র মানুষের জন্য বড় স্বস্তি আনতে পারে। শীতের এই সময়ে চুয়াডাঙ্গার প্রতিটি সকাল যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতির এই কঠিন পরীক্ষায় টিকে থাকতে হলে মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় শক্তি।