ট্রাম্পের হুমকির জবাবে কিউবার কড়া বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬০ বার
ট্রাম্পের হুমকির কড়া প্রতিক্রিয়া কিউবা

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুমকির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কিউবা। ওয়াশিংটন থেকে দেওয়া সর্বশেষ বক্তব্যে ট্রাম্প কিউবাকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যেন দ্রুত একটি নির্দিষ্ট চুক্তির আওতায় আসে, অন্যথায় দেশটিকে “অনির্দিষ্ট পরিণতির” মুখোমুখি হতে হবে। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের ইতিহাস থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে আবারও সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কিউবার বিষয়ে অন্য কোনো দেশের নাক গলানোর অধিকার নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, কিউবা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তাদের কী করতে হবে তা বাইরের কেউ নির্দেশ দিতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ক্যারিবীয় এই দ্বীপরাষ্ট্র নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে রক্তের শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত।

ডিয়াজ-ক্যানেলের এই বক্তব্য কিউবার জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যমে এটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে এটি কিউবার এক ধরনের প্রতিরোধের বার্তা। কিউবার ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই উত্তেজনাপূর্ণ। শীতল যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার অভাব স্পষ্ট।

কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজও ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিউবার সার্বভৌম অধিকার অনুযায়ী তারা যে কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি করার অধিকার তাদের রয়েছে। রদ্রিগেজের ভাষায়, কিউবা বর্তমানে ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে জ্বালানি আমদানি করে থাকে এবং এটি সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এতে অন্য কোনো দেশের আপত্তি তোলার সুযোগ নেই।

রদ্রিগেজ আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে কিউবার বিরুদ্ধে যে অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে, তা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির পরিপন্থী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে ‘অপরাধমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এসব পদক্ষেপ শুধু কিউবার জনগণের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে না, বরং বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য তার আগের প্রেসিডেন্সির সময়কার কড়া পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা। তিনি এর আগেও কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইরান এবং গ্রিনল্যান্ডের মতো দেশ ও অঞ্চলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই কৌশল অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন জোগাড়ের অংশ হিসেবেও দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিউবা ইস্যু বরাবরই স্পর্শকাতর, বিশেষ করে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে বসবাসকারী কিউবান বংশোদ্ভূত ভোটারদের কারণে।

কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবরোধ কিউবার অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির সংকট কিউবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের নতুন করে হুমকি দেওয়াকে অনেকেই কিউবার ওপর আরও চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখছেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের ‘অনির্দিষ্ট পরিণতি’ শব্দবন্ধটি কূটনৈতিক ভাষায় অত্যন্ত গুরুতর ইঙ্গিত বহন করে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা থেকে শুরু করে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করা কিংবা সামরিক চাপ সৃষ্টির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে কিউবার পক্ষ থেকে যে দৃঢ় অবস্থান জানানো হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে তারা সহজে কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়।

কিউবার জনগণের একাংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুমকি নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তারা অবরোধ ও চাপের মধ্যেই জীবনযাপন করে আসছেন। তবুও জাতীয় গৌরব ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা আপসহীন। হাভানার এক বাসিন্দা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি, কিন্তু মাথা নত করিনি। এই দেশ আমাদের, সিদ্ধান্তও আমাদেরই হবে।

অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ কিউবার পাশে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকোর সঙ্গে কিউবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নতুন নয়। এই দেশগুলো বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে আসছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের হুমকি লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই উত্তেজনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সংকট চলছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বিশ্ব কূটনীতিতে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সাধারণত এ ধরনের সংকটে সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে থাকে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের হুমকি ও কিউবার কড়া প্রতিক্রিয়া আবারও প্রমাণ করল, দুই দেশের সম্পর্ক এখনো গভীর অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্বে আটকে আছে। কিউবার নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অবস্থান পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই উত্তেজনা সংলাপের পথে যাবে নাকি আরও সংঘাতের দিকে মোড় নেবে—সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত