প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আগে সম্পদ সৃষ্টি এবং সেই সম্পদের সঠিক বণ্টনের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন—এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি নতুন কোনো বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সংবিধানেই বহু আগে স্বীকৃত। অথচ বাস্তবতা হলো, আজও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য নতুন করে আন্দোলন ও দাবি উত্থাপন করতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার (আইএলও) উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ড. মঈন খান। সভায় দেশের শ্রম পরিস্থিতি, শ্রমিকদের অধিকার, মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের নানা দিক উঠে আসে। শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে এই আলোচনা সভা শ্রমনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগায়।
ড. মঈন খান তার বক্তব্যে বলেন, শ্রমিকের অধিকার বাস্তবায়নের বিষয়টি আজকের নয়, এটি স্বাধীনতার পরপরই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রায় ৫৪ বছর আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রমিকের অধিকার স্বীকৃতি পাওয়ার পরও যদি আজ শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তবে বুঝতে হবে কোথাও বড় ধরনের ব্যর্থতা রয়েছে। তার মতে, শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের বাস্তব প্রয়োগ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য যে সব দাবি-দাওয়া সামনে আসে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের হাতে আগে পর্যাপ্ত সম্পদ থাকতে হবে। সম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু সেই সম্পদ কীভাবে সৃষ্টি হবে, কীভাবে তা ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টিত হবে এবং কোন খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন কেবল বৈষম্যই বাড়ায়, শ্রমিকদের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না।
আলোচনা সভায় ড. মঈন খান বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বায়নের যুগে শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, স্বয়ংক্রিয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র যদি আগাম পরিকল্পনা না করে, তবে শ্রমিক শ্রেণি আরও পিছিয়ে পড়বে।
একই আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান শ্রমিক ইশতেহার নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক আন্দোলন ও শ্রমিকদের স্বার্থে যারা কাজ করে আসছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শের ভিত্তিতেই একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রমিক ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। এই ইশতেহার কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; এটি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার একটি রূপরেখা।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবেন, এই শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তাবে। তবে ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। তাদের কাজ হবে সরকারকে প্রতিনিয়ত চাপের মুখে রাখা, যেন শ্রমিকদের অধিকার প্রশ্নে কোনো আপস না করা হয়।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, আর শ্রমজীবী মানুষ সেই জনগণের একটি বিশাল অংশ। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে শ্রমিকদের ভূমিকা অপরিসীম। শিল্প, কৃষি, সেবা খাত—সব জায়গায় শ্রমিকরাই মূল চালিকাশক্তি। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণে শ্রমিকদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
নজরুল ইসলাম খান শ্রমিকদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের যে দাবিগুলো ইশতেহারে উঠে এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা জরুরি। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো একটি দলের একক দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। শ্রমজীবী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের জীবনে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আনা রাজনীতিকদের নৈতিক কর্তব্য।
আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া শ্রমিক নেতারা বলেন, বাস্তব জীবনে শ্রমিকদের নানা সমস্যার কথা বারবার উঠে এলেও কার্যকর সমাধান খুব কমই দেখা যায়। ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসরকালীন সুবিধা—এই মৌলিক বিষয়গুলো এখনও অনেক শ্রমিকের নাগালের বাইরে। তারা আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিকার অর্থে শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়, তবে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তব পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, শেরেবাংলা নগরের এই আলোচনা সভা শ্রমিকদের অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা জোরদার করেছে। ড. মঈন খানের সম্পদ সৃষ্টি ও পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া বক্তব্য এবং নজরুল ইসলাম খানের শ্রমিক ইশতেহার বাস্তবায়নের আহ্বান শ্রমনীতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দিচ্ছে। সামনে নির্বাচনকে ঘিরে এই শ্রমিক ইশতেহার কতটা গুরুত্ব পায় এবং বাস্তবে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।