নাসিরনগরে গোষ্ঠী সংঘর্ষে ইউপি সদস্য নিহত, আহত অর্ধশতাধিক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
নাসিরনগরে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে ইউপি সদস্য নিহত ১

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত বিরোধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এতে সাবেক এক ইউপি সদস্য নিহত হয়েছেন এবং নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সংঘর্ষের পর থেকে ধরমন্ডল এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলাকায় বাড়তি সতর্কতা জারি রেখেছে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেলে উপজেলার ধরমন্ডল এলাকায় সাবেক ওয়ার্ড মেম্বার জিতু মিয়া ও সাবেক মেম্বার রমজান মিয়ার গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আধিপত্য বিস্তার, সামাজিক প্রভাব ও এলাকায় কর্তৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এর আগেও একাধিকবার ছোটখাটো বিরোধ ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটলেও তা বড় সংঘর্ষে রূপ নেয়নি। তবে সোমবার বিকেলে সেই বিরোধই ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকাল আনুমানিক ৪টার দিকে প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে উভয় পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র ও ইটপাটকেল ছোড়াছুড়িতে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আশপাশের বসতবাড়ির মানুষজন ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেননি। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, রাস্তায় চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।

সংঘর্ষ চলাকালে সাবেক ওয়ার্ড মেম্বার জিতু মিয়া গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহত জিতু মিয়ার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

আহতদের নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ আশপাশের বিভিন্ন ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে নারী ও বয়স্ক লোকজনও রয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অনেকের মাথা, হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স মোতায়েন করা হয়েছে।

খবর পেয়ে নাসিরনগর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষ থামাতে পুলিশকে প্রথমে বেগ পেতে হলেও পরে স্থানীয়দের সহায়তায় পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরবর্তী সহিংসতা ঠেকাতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও এলাকায় নামানো হয়েছে। বর্তমানে ধরমন্ডল এলাকা জুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে সংঘর্ষ থামায়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সংঘর্ষে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আরও জানান, ঘটনার পর থেকে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেওয়া হবে না।

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সন্ধ্যার পর থেকেই এলাকায় লোকজনের চলাচল কমে যায়। দোকানপাট আগেভাগেই বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিনের বিরোধ মীমাংসা না হওয়ায় এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। তারা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বলছেন, নাসিরনগরের বিভিন্ন এলাকায় গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব নতুন নয়। রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক নেতৃত্ব ও স্থানীয় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে প্রায়ই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তবে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও সময়মতো হস্তক্ষেপ না থাকলে এসব বিরোধ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়। তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে সালিশ ও সামাজিক সমঝোতার উদ্যোগ জোরদার করার আহ্বান জানান।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গ্রামভিত্তিক রাজনীতি ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। এতে শুধু প্রাণহানিই নয়, পুরো এলাকার সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। শিশু, নারী ও নিরীহ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি।

নিহত জিতু মিয়ার পরিবারে শোকের মাতম চলছে। পরিবারের সদস্যরা তার হত্যার বিচার দাবি করেছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু তা গুরুত্ব পায়নি। এখন এই প্রাণহানির দায় কে নেবে—এই প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এলাকাবাসীর অনেকেই মনে করছেন, আগেভাগে প্রশাসনিকভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে হয়তো এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো যেত।

এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় সভা-সমাবেশ ও জমায়েত এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ উসকানিমূলক তথ্য ছড়ালে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে নাসিরনগরের ধরমন্ডল এলাকার এই সংঘর্ষ আবারও প্রমাণ করল, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। একটি প্রাণহানি, অর্ধশতাধিক আহত এবং পুরো এলাকার আতঙ্কিত পরিবেশ—এই মূল্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যতে এমন সহিংসতা রোধে স্থায়ী সমাধান দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত