প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বহুল আলোচিত মাতারবাড়ী তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দীর্ঘ প্রায় নয় ঘণ্টার চেষ্টায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সোমবার রাত ৯টার দিকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরের স্ক্র্যাব ইয়ার্ডে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টানা প্রচেষ্টায় মঙ্গলবার ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটের দিকে আগুন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই অগ্নিকাণ্ডে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল প্লান্ট অক্ষত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ফায়ার সার্ভিস জানায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্ক্র্যাব ভাগাড়ে কাঠ, পরিত্যক্ত নির্মাণসামগ্রী ও বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় মালামাল স্তুপ করে রাখা ছিল। ওই ভাগাড় থেকেই আগুনের সূত্রপাত ঘটে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রাতের আঁধারে আগুনের লেলিহান শিখা দূর থেকে দেখা যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মহেশখালী ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) রাম প্রসাদ সেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে দ্রুত দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বললেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণের পর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, স্ক্র্যাব ইয়ার্ডে দাহ্য বস্তু বেশি থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা সময় লেগেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোমবার রাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন একটি ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে তারা হঠাৎ ভেতরে আগুন জ্বলতে দেখেন। প্রথমে অনেকে ভেবেছিলেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল স্থাপনায় আগুন লেগেছে। এতে এলাকায় চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। কারণ মাতারবাড়ী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, যা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরের স্ক্র্যাব ইয়ার্ডে আগুন লেগেছিল। কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি এবং পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মাতারবাড়ী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি মাইলফলক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। তাই এই প্রকল্প এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় শিল্পপ্রকল্প এলাকায় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
ঘটনার পরপরই বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত তৎপরতা দেখা যায়। আগুন যাতে মূল প্লান্ট বা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নেভানোর পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় পানি ছিটিয়ে আগুনের তীব্রতা কমানোর চেষ্টা করেন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, স্ক্র্যাব ইয়ার্ডে দাহ্য বস্তু খোলা জায়গায় দীর্ঘদিন জমা করে রাখলে আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় এই ধরনের ভাগাড় ব্যবস্থাপনায় আরও আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। তারা মনে করছেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে একটি কার্যকর অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। তবে একই সঙ্গে তারা দাবি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় নিরাপত্তা ও নজরদারি আরও বাড়ানো হোক, যাতে এমন ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক না ছড়ায়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে তদন্ত করা হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট অথবা কোনো দাহ্য বস্তুর কারণে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অগ্নিকাণ্ড বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনেনি—এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল প্লান্ট অক্ষত থাকায় জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহেও কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তবে এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে অগ্নি নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।