প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সূর্যের দেখা মিললেও শীতের তীব্রতা একটুও কমেনি উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মৌসুমে শীতের প্রকোপের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরেই এই সীমান্তবর্তী উপজেলায় তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। এতে করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, দিনমজুর, কৃষক ও খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠীর জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
মঙ্গলবার সকালে সূর্যের মুখ দেখা গেলেও আকাশে ঘন কুয়াশার কারণে রোদের তেজ ছিল খুবই কম। কুয়াশার ঘনত্ব কিছুটা কমলেও উত্তরের হিমেল বাতাস এবং কনকনে শীতের কারণে ঠান্ডার অনুভূতি ছিল তীব্র। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত চারপাশে কুয়াশার চাদর থাকায় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে যানবাহন চলাচল করেছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। অনেক জায়গায় যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী ও চালকরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সূর্য উঠলেও বাতাসে উষ্ণতা নেই। শরীর ছুঁয়ে যাওয়া ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপুনি থামছে না। বিশেষ করে ভোর ও রাতের দিকে শীতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে শিশুরা সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে, বাড়ছে শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও।
তেঁতুলিয়া উপজেলার সাহেবজোত গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “কনকনে শীতে হাত-পা জড়োসড়ো হয়ে আসছে। ভোরে মাঠে গেলে শরীর যেন কাজ করতে চায় না। তবুও জীবন-জীবিকার তাগিদে কাজে যেতে হচ্ছে। ফসলের দেখভাল না করলে তো সংসার চলবে না।” তার মতো অনেক কৃষকই শীত উপেক্ষা করে মাঠে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে সীমান্তবর্তী নদী মহানন্দা ও আশপাশের এলাকায় কাজ করা পাথর ও বালু শ্রমিকদের অবস্থা আরও করুণ। রণচন্ডি এলাকার পাথর শ্রমিক রাজিউর রহমান বলেন, “নদীর পানি বরফের মতো ঠান্ডা। পানিতে পা নামালেই শরীর অবশ হয়ে আসে। কিন্তু প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত নদীতে নামতে হয়। ঠান্ডা উপেক্ষা করে কাজ না করলে পরিবার না খেয়ে থাকবে।” তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে শীতের সঙ্গে জীবিকার কঠিন লড়াইয়ের গল্প।
শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষ। খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষগুলো শীত নিবারণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অনেককে দেখা গেছে আগুন জ্বালিয়ে কিংবা ছেঁড়া কাপড় গায়ে জড়িয়ে শীত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু শীতবস্ত্র বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কৃষি খাতেও শীতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কুয়াশা ও শীতের কারণে শীতকালীন সবজি, আলু ও বোরো ধানের বীজতলায় রোগবালাইয়ের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় কুয়াশা থাকলে ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই কৃষকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, দিনের তাপমাত্রা তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও হিমেল বাতাস ও কুয়াশার কারণে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, “বর্তমানে পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক দিন এই অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে।” আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাত ও ভোরের দিকে তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে উত্তরাঞ্চলে এ ধরনের শৈত্যপ্রবাহ নতুন নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীতের প্রকৃতি এখন কিছুটা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। কখনো হঠাৎ তীব্র শীত, আবার কখনো তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া—এই বৈচিত্র্য মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে স্থানীয় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা গরম কাপড় ব্যবহারের পাশাপাশি গরম খাবার ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরামর্শ দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, সূর্যের দেখা মিললেও তেঁতুলিয়াসহ পঞ্চগড়ের জনজীবনে শীতের তীব্রতা এখনো কাটেনি। হিমেল বাতাস, কুয়াশা আর কম তাপমাত্রার দাপটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কষ্ট লাঘবের কোনো সহজ উপায় দেখছেন না এখানকার মানুষ। তারা আশা করছেন, দ্রুত শৈত্যপ্রবাহ কেটে গিয়ে স্বাভাবিক উষ্ণতা ফিরবে, আর তাতেই মিলবে স্বস্তি।