প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে ব্যর্থ হলে দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব সম্মিলিতভাবে হুমকির মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে শুধু সরকার নয়, বরং পুরো জাতিকেই চরম খেসারত দিতে হবে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে শামসুজ্জামান দুদু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, নির্বাচন ঘিরে জনগণের উদ্বেগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তিনি দেশের ভাগ্য নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন।
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, আগামী নির্বাচন শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তিনি উল্লেখ করেন, যদি এই নির্বাচন সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত না হয়, যদি জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে দেশের স্বাধীনতা সর্বসম্মতভাবে হুমকির মুখে পড়বে। তার ভাষায়, এর দায় শুধু ক্ষমতাসীনদের ওপর বর্তাবে না, বরং পুরো জাতিকেই এই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে এখন আর খুব বেশি সময় নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য হাতে রয়েছে এক মাসেরও কম সময়। এই সময়ের মধ্যেই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নির্বাচনের পরপরই দেশে একটি সরকার গঠিত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই সরকার যদি সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক হয় এবং মানুষের অনুভূতি ও প্রত্যাশা বুঝতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। অন্যথায় দেশ নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে পড়বে।
শামসুজ্জামান দুদু তার বক্তব্যে নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য যেসব শর্ত অপরিহার্য, সেগুলোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, মানুষের নির্বিঘ্নে, নির্ভয়ে এবং নিরাপত্তার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই ভালো নির্বাচনের প্রথম শর্ত। তার অভিযোগ, গত ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে ভোটের ফলাফল ভোটগ্রহণের আগেই নির্ধারিত হয়ে যেত, ফলে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে সাধারণ মানুষ।
তিনি বলেন, এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত ও কার্যকর উন্নতি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা ভালো থাকা মানে শুধু সরকারের স্বার্থ রক্ষা নয়, বরং এটি দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তির প্রশ্ন। তার মতে, সরকার বিষয়টি ভালোভাবেই জানে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এখনো পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
শামসুজ্জামান দুদু অভিযোগ করেন, এই অবহেলা এবং উদাসীনতার ফলেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তিনি বলেন, এসব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তরুণরা, রাজনৈতিক কর্মীরা এবং সাধারণ মানুষ। তিনি তার বক্তব্যে তরুণ ছাত্রনেতা হাদির হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি অশনি সংকেত। এমন পরিস্থিতিতে ভালো নির্বাচনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভালো নির্বাচনের জন্য এখনো যে কয়েকটি দিন সময় রয়েছে, তা কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না। এই সময়ের মধ্যেই তড়িৎগতিতে বৈধ ও অবৈধ সব ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। অস্ত্রের দাপট কমানো না গেলে ভোটকেন্দ্রে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তার মতে, অস্ত্রের উপস্থিতি নির্বাচনকে প্রভাবিত করে এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
বিক্ষোভ সমাবেশে শামসুজ্জামান দুদু গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একদিকে জনগণ ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। তার মতে, সরকার যদি সত্যিই জনগণের কথা ভাবত, তাহলে নির্বাচন সামনে রেখে এমন সিদ্ধান্ত নিত না, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে।
সমাবেশে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার লুৎফর রহমানও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার জন্য সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য। ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ থাকে না। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ সুগম করতে।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের মুখপাত্র এস এম শাহাদাতসহ আরও কয়েকজন নেতা এই কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন। বক্তারা তাদের বক্তব্যে নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে দেশের রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শামসুজ্জামান দুদুর বক্তব্য আসন্ন নির্বাচন ঘিরে বিরোধী দলগুলোর উদ্বেগ ও আশঙ্কার প্রতিফলন। তারা মনে করছেন, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই আইনশৃঙ্খলা, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে।
সব মিলিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভ সমাবেশ শুধু গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বা অস্ত্র উদ্ধারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার বহিঃপ্রকাশ ছিল। শামসুজ্জামান দুদুর কণ্ঠে উঠে আসা সতর্কবার্তা স্পষ্ট করে দেয়, ভালো নির্বাচন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব শুধু একটি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।