কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৩ বার

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ যখন ক্রমেই বাড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত দিল নির্বাচন কমিশন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনি জোটের সমর্থিত এনসিপি প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহর মনোনয়ন বৈধ বলে রায় দিয়েছে কমিশন। এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিতে যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও সৃষ্টি করেছে নতুন আলোচনা।

শনিবার বিকেল চারটায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন কমিশন ভবনের বেজমেন্ট-২ অডিটরিয়ামে দীর্ঘ শুনানি শেষে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কুমিল্লা-৪ আসনকে ঘিরে উত্থাপিত পাল্টাপাল্টি আপিল, অভিযোগ ও আইনি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেই এই রায় দেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লা-৪ আসন বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। দেবিদ্বার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটের লড়াই প্রায় সব সময়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এবারের নির্বাচনেও এই আসনে বিএনপি ও ১০ দলীয় জোটের অবস্থান ঘিরে শুরু থেকেই আলোচনা চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নির্বাচনি সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের পর মঞ্জরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধতা নিয়ে আপত্তি ওঠে। একই সময়ে এনসিপি প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহর মনোনয়ন নিয়েও আপিল করা হয়। ফলে বিষয়টি গড়ায় কমিশনের আনুষ্ঠানিক শুনানিতে। শনিবারের শুনানিতে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেন। আইনগত দিক, নির্বাচন আচরণবিধি এবং জমা দেওয়া কাগজপত্র বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়।

শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দেয়, মঞ্জরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে এবং হাসনাত আবদুল্লাহর মনোনয়ন বৈধ থাকছে। কমিশনের এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অডিটরিয়ামে উপস্থিত রাজনৈতিক কর্মী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি নির্বাচন আইন ও বিধিমালার আলোকে নেওয়া হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো প্রার্থী বা দলের পরিচয় নয়, বরং কেবল আইনগত যোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিক নথির ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কমিশন স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছে বলেও দাবি করা হয়।

মনোনয়ন বাতিল হওয়া বিএনপি প্রার্থী মঞ্জরুল আহসান মুন্সী বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ঘনিষ্ঠ মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য অপ্রত্যাশিত হলেও তারা আইনি পথ খোলা আছে কি না, তা পর্যালোচনা করছেন। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এ সিদ্ধান্তে হতাশা ও ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনের আগে এই ধরনের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

অন্যদিকে, এনসিপি প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহর শিবিরে দেখা গেছে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস। ১০ দলীয় নির্বাচনি জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে আইন ও নিয়মের ভিত্তিতেই প্রার্থিতা নির্ধারিত হচ্ছে। হাসনাত আবদুল্লাহ নিজেও বলেছেন, তিনি শুরু থেকেই নির্বাচনি আইন মেনে চলার চেষ্টা করেছেন এবং কমিশনের সিদ্ধান্তে তিনি সন্তুষ্ট।

হাসনাত আবদুল্লাহ সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত একটি নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ের প্রচারণায় তার উপস্থিতি নজর কেড়েছে। ফলে কুমিল্লা-৪ আসনে তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই আসনের নির্বাচনি লড়াই নতুন মাত্রা পেল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি আসনের প্রার্থী নির্ধারণের বিষয় নয়। এটি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশের প্রতিফলনও বটে। নির্বাচনের আগে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও আপিল নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কতটা দৃঢ় ও স্বাধীন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকে। কুমিল্লা-৪ আসনের এই সিদ্ধান্ত সেই আলোচনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

দেবিদ্বার এলাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। অনেক ভোটার মনে করছেন, প্রার্থী নির্ধারণে স্বচ্ছতা থাকলে ভোটের আগ্রহ বাড়বে। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, হঠাৎ করে প্রার্থী পরিবর্তনের ফলে নির্বাচনি হিসাব-নিকাশ বদলে যেতে পারে।

এই ঘটনার পর কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির নির্বাচনি কৌশল কী হবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। মনোনয়ন বাতিলের ফলে দলটি বিকল্প কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, কিংবা আইনি লড়াইয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। অন্যদিকে, এনসিপি ও ১০ দলীয় জোট এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের জন্য ইতিবাচক মোড় হিসেবে দেখছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আপিল শুনানি ও মনোনয়ন সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত নির্ধারিত সময়সূচির মধ্যেই শেষ করা হবে, যাতে নির্বাচনি কার্যক্রম নির্বিঘ্নে এগিয়ে নেওয়া যায়। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন, তারা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা চালাতে পারবেন।

সব মিলিয়ে, কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল এবং এনসিপি প্রার্থীর বৈধতা ঘোষণার সিদ্ধান্ত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিল। এই সিদ্ধান্ত দেবিদ্বারের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে এবং ভোটের মাঠে এর প্রতিফলন কেমন হয়, সেদিকে এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ ভোটাররা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত