ইন্দো-প্যাসিফিক ঘিরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিশ্বরাজনীতির নতুন দিগন্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৩ বার
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশ্বরাজনীতি

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

একুশ শতকের বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে দ্রুত উঠে এসেছে ইন্দো-প্যাসিফিক। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃত জলরাশি এবং এই দুই মহাসাগরকে ঘিরে থাকা দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই অঞ্চল এখন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। সামরিক শক্তি, সমুদ্র বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্ব ইতিহাসে একসময় ইউরোপ ছিল রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্য তেল ও গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক গুরুত্ব অর্জন করে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যকে ছাড়িয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলই বিশ্বের প্রধান ভূরাজনৈতিক ভরকেন্দ্র। এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই বিশ্বের বৃহৎ অংশের সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্পন্ন হয় এবং এখানেই অবস্থিত বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলো।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ এখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তি এবং চীনের মতো উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি। পাশাপাশি রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি এবং দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো। বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশও এই অঞ্চলের কৌশলগত বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান উদ্বেগের নাম চীন। একুশ শতকে চীন যেভাবে সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই বাস্তবতাকে অনেক বিশ্লেষক থুসিডাইসিস ট্রাপের সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে একটি উদীয়মান শক্তি যখন একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির প্রভাব ও কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ঘোষণা করে। এই কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখ করে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বসবাসকারী জনসংখ্যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি এবং এর একটি বড় অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী। এই অঞ্চল দিয়েই বিশ্বের জ্বালানি সম্পদের বড় অংশ পরিবহন হয় এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক সীমানার একটি বিশাল অংশ এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুই-তৃতীয়াংশ আসে এই অঞ্চল থেকে, যা ইন্দো-প্যাসিফিককে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, যদি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের আধিপত্য একচেটিয়াভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সমুদ্রপথে বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় চীনের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করছে।

চীন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বেইজিংয়ের দাবি, তারা কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী নয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা জলসীমায় জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে না। চীনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট ইচ্ছাকৃতভাবে চীনকে ঘিরে ফেলার কৌশল গ্রহণ করেছে, যাতে তাদের উত্থান ঠেকানো যায়।

এই অঞ্চলে চীনের সঙ্গে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর একাধিক দ্বন্দ্বও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে। চীন ও ভারতের সীমান্ত বিরোধ, চীন ও তাইওয়ানের রাজনৈতিক উত্তেজনা, চীন ও জাপানের দ্বন্দ্ব এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। যদিও এসব দ্বন্দ্ব সরাসরি যুদ্ধে রূপ নেয়নি, তবুও এগুলো আঞ্চলিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটেই ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে কোয়াড জোট গঠিত হয়। যদিও এটি প্রথমদিকে নিষ্ক্রিয় ছিল, ২০১৭ সালের পর থেকে জোটটি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোয়াডের ঘোষিত লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মুক্ত নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করা।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত এবং বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির ওপর দেশের প্রত্যক্ষ অধিকার রয়েছে। এই জলরাশির গভীরে রয়েছে তেল, গ্যাস, জীববৈচিত্র্য ও নবায়নযোগ্য শক্তির বিপুল সম্ভাবনা, যা ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

বাংলাদেশ এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই ২০২৩ সালে নিজস্ব ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক প্রকাশ করে। এতে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানায়, তারা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে সব দেশের জন্য উন্মুক্ত রাখতে চায় এবং শান্তি, সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া কিংবা ইউরোপ—কোনো পক্ষের সঙ্গে একচেটিয়া জোটে না গিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখাই বাংলাদেশের কৌশল।

এদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে চীন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে সংযুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে। ১৫৫টি দেশের অংশগ্রহণে এই প্রকল্প চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এখন কেবল শক্তির প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়, বরং এটি একটি সূক্ষ্ম কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের মঞ্চ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘমেয়াদি হলেও সরাসরি সংঘাতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। বরং সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বাণিজ্য ও প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়েই এই প্রতিযোগিতা চলবে।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। বাংলাদেশসহ মধ্যম ও উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোর জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক বাস্তবতা একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে ঝুঁকি। কৌশলগত বিচক্ষণতা, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এই জটিল বিশ্বরাজনীতিতে টিকে থাকার পথ খুঁজে নিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত