প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতার পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যুক্ত হলো নাটোরের বড়াইগ্রামে। দেশে প্রথমবারের মতো এখানে চালু হলো অত্যাধুনিক সেচব্যবস্থা ‘সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম’। দীর্ঘদিন ধরে সনাতন ও পানিখেকো সেচ পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল দেশের কৃষিখাতে এই প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন, পানিসাশ্রয় এবং সময় ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার ভবানীপুরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ইক্ষু খামারে এই আধুনিক সেচব্যবস্থার প্রথম বাস্তবায়ন হয়েছে। অস্ট্রিয়ার কারিগরি সহায়তায় এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর পানাসি প্রকল্পের আর্থিক সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। পরীক্ষামূলক সেচ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে খামার কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করা হয়।
সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম মূলত একটি ঘূর্ণনভিত্তিক সেচ প্রযুক্তি। এতে একটি কেন্দ্রীয় পয়েন্টকে ঘিরে দীর্ঘ পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত স্প্রিংকলার চাকার সাহায্যে বৃত্তাকারে ঘুরে জমিতে সেচ দেয়। স্প্রিংকলার থেকে ওপর থেকে বৃষ্টির মতো পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যা জমিতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে উঁচু-নিচু জমিতেও একইভাবে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় এবং পানির অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
গত ২ জানুয়ারি থেকে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাভুক্ত ভবানীপুর ও ঈশ্বরদীর মুলাডুলি কৃষি খামারে পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতিতে সেচকাজ শুরু হয়। পাবনা-নাটোর-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মোট তিন কোটি ৯৮ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে অস্ট্রিয়ার বায়ার কোম্পানির সহযোগিতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শেরপা পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং।
প্রযুক্তিগত তত্ত্বাবধান ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রকল্পে যুক্ত রয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। চীনের মিস্টার জ্যাক এবং ভিয়েতনামের মিস্টার খোয়া প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক তদারকি ও স্থানীয় জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে আধুনিক এই প্রযুক্তির ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে স্থানীয় প্রকৌশলী ও কর্মীদের দক্ষ করে তোলা হচ্ছে।
দুটি প্রকল্পের মধ্যে বড়াইগ্রামের ভবানীপুর খামারে ইতোমধ্যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে ঈশ্বরদীর মুলাডুলি ইক্ষু খামারে কাজ এখনো চলমান রয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পের মাধ্যমে একসঙ্গে প্রায় ১২৫ একর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। বড় আকারের কৃষিজমিকে স্বল্প সময়ে ও কম পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়ার এই প্রযুক্তি দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সজীব আল মারুফ বলেন, সুগার মিলের কৃষি খামারে আধুনিক সেচব্যবস্থা স্থাপনের ফলে একসঙ্গে বড় পরিসরে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। প্রচলিত গভীর ও অগভীর নলকূপনির্ভর সেচ ব্যবস্থায় জমির প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পানি ব্যবহার করা হয়, যা একদিকে পানির অপচয় ঘটায়, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামিয়ে দেয়। আধুনিক এই সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কম খরচে, স্বল্প সময়ে এবং কম পানিতে অধিক জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে পানির সাশ্রয় নিশ্চিত হবে এবং সারা বছর সেচ সুবিধা বজায় থাকবে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) নাটোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, দেশে প্রথমবারের মতো নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাধীন বড়াইগ্রামের ভবানীপুর কৃষি খামারে সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এখানে এক কোটি ৯৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি পানিসাশ্রয়ী সবচেয়ে আধুনিক সেচ প্রযুক্তিগুলোর একটি, যা কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হবে।
বিএডিসির পাবনা রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ বলেন, এই পদ্ধতিতে চাকার সাহায্যে সেচ যন্ত্র বৃত্তাকারে ঘুরে জমিতে বৃষ্টির ফোটার মতো পানি ছিটিয়ে দেয়। ফলে জমির প্রতিটি অংশ সমানভাবে পানি পায়। উঁচু-নিচু জমিতে যেখানে প্রচলিত সেচ পদ্ধতিতে সমান পানি দেওয়া কঠিন, সেখানে এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর ফলে ফসল উৎপাদন ত্বরান্বিত হবে এবং ফলনের গুণগত মানও উন্নত হবে।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ভবানীপুর খামারের ইনচার্জ মাহাবুব-উল ইসলাম জানান, খামারের মোট জমির পরিমাণ ৭০১ একর। এর মধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে ১২৫ একর জমিতে আধুনিক সেচ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের জিএম (কৃষি) বাকী বিল্লাহ বলেন, প্রচলিত সেচ পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতি অনেক বেশি সাশ্রয়ী। কম পানি ও কম সময়ের মাধ্যমে বেশি জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে খামারের প্রায় ২০ একর পতিত জমি এই প্রকল্পের মাধ্যমে চাষযোগ্য জমিতে রূপান্তরিত হবে, যা সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো এই আধুনিক সেচব্যবস্থা চালু হওয়ায় কৃষিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হলো। পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সফল বাস্তবায়নের পর দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে পানির প্রাপ্যতা দিন দিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিকে টেকসই করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নাটোরের বড়াইগ্রামে এই সাফল্য ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য কৃষি অঞ্চলে আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের পথ দেখাবে—এমন প্রত্যাশাই এখন কৃষক, প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারকদের।