শাহবাগের ইতিহাসের সাক্ষী ‘প্রজন্ম চত্বর’ ভাঙল সিটি করপোরেশন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ জুলাই, ২০২৫
  • ৪৫ বার

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর শাহবাগ চত্বর, যা এক সময় ‘প্রজন্ম চত্বর’ নামেই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল, সেটি আর থাকল না। শনিবার রাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) হঠাৎ করেই ত্রিকোণাকৃতির আলোচিত ইলেকট্রিক বিলবোর্ডের স্থাপনাটি ভেঙে ফেলে দিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে শাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি একসময় শুধু বিজ্ঞাপন নয়, রাজনৈতিক আন্দোলন, সংস্কৃতি ও নাগরিক প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

ডিএসসিসির উপ–রাজস্ব কর্মকর্তা শাহজাহান আলী জানিয়েছেন, এই স্থাপনাটি ২০০৮ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল। মূলত বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জন্যই করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে এই বিলবোর্ডটি বসানো হয়। তখন করপোরেশনের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও রাজনৈতিক ব্যক্তি অনুমতি নিয়ে এমন স্থাপনা তৈরি করেছিল। শাহবাগের এই স্থাপনাটিও সেই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে।

তবে দেশের ইতিহাসে ‘প্রজন্ম চত্বর’ নামটি বহন করে যে আলাদা রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য বহন করেছিল, সেটি এই স্থাপনাটিকে শুধু আরেকটি বিলবোর্ডে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ চত্বরে যে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠেছিল, সেসময় এই ত্রিকোণ বিলবোর্ডের নিচেই হাজারো মানুষের স্লোগান, ব্যানার ও পোস্টারে ভরে উঠেছিল পুরো মোড়। দেশের নতুন প্রজন্ম সেখানে দাঁড়িয়ে একাত্তরের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের শপথ নিয়েছিল। সেই থেকে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে স্থাপনাটি ‘প্রজন্ম চত্বর’ নামে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্থাপনাটির তেমন যত্ন হয়নি। বিজ্ঞাপন প্রদর্শন ব্যাহত হতে থাকে। নাগরিক অভিযোগে বলা হচ্ছিল, এটি অকারণে স্থান দখল করছে, আশপাশের ট্রাফিক ব্যবস্থায়ও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকা এই ইলেকট্রিক বিলবোর্ডটি অবশেষে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় সিটি করপোরেশন।

ডিএসসিসি সূত্র বলছে, নগরের সৌন্দর্য রক্ষা, অবৈধ ও অকেজো স্থাপনা সরিয়ে পথচারী ও যান চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধি করতে করপোরেশন ধারাবাহিকভাবে এমন অভিযান চালাচ্ছে। শাহবাগের স্থাপনাটিও সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ভাঙা হলো।

তবে এই স্থাপনা ভাঙাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, ‘প্রজন্ম চত্বর’ শুধু একটি বিলবোর্ড ছিল না, এটি একটি প্রজন্মের ইতিহাস, স্বপ্ন ও সংগ্রামের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই এর স্থলে একটি যথার্থ স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন বা ন্যূনতম একটি চিহ্নিতকরণ ফলক রাখা উচিত ছিল।

শাহবাগ চত্বর এখনও রাজধানীর অন্যতম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু। এখানে নিয়মিত ছোট-বড় সমাবেশ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। নতুন প্রজন্মের কাছে শাহবাগ এখনও প্রতিবাদের প্রতীক। স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার পর এই প্রতীকী জায়গাটি কীভাবে সংরক্ষিত থাকবে—তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে শাহবাগ মোড়ের নান্দনিক উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হতে পারে। তবে ‘প্রজন্ম চত্বর’ স্মৃতিকে কোনোভাবে সংরক্ষণের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এখন দেখার বিষয়, আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতি বহনকারী শাহবাগের এই চত্বর নতুন প্রজন্মের ইতিহাসে কীভাবে টিকে থাকে—মাঠে নেমে আসা মানুষ, নাগরিক সমাজ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মই তা ঠিক করবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত