শ্রীমঙ্গলে তীব্র শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১১.৭

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
শ্রীমঙ্গলে তীব্র শীতের প্রকোপ

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের শীতলতম অঞ্চল হিসেবে পরিচিত চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে চলতি শীত মৌসুমে তীব্র শীতের প্রকোপ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কনকনে ঠাণ্ডা, ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এখানকার জনজীবন। বুধবার শ্রীমঙ্গলে চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। শীতের এই তীব্রতা শুধু শহরাঞ্চলেই নয়, গ্রাম ও চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও মানুষকে নাজেহাল করে তুলেছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান জানান, বুধবার ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। তাঁর ভাষায়, কয়েক দিন ধরেই তাপমাত্রা নিম্নমুখী ছিল, তবে বুধবারের শীত ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি তীব্র। রাতভর কুয়াশা আর ভোরের হিমেল বাতাসে শীতের অনুভূতি আরও বেড়ে যায়। সূর্যের দেখা মিললেও তাপমাত্রা বাড়তে সময় লেগেছে, ফলে সকালবেলা কাজে বের হওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

শীতের এই প্রকোপে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, চা-বাগানের শ্রমিক, বৃদ্ধ ও শিশুরা। অনেকেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে ভোরে কাজে বের হতে পারছেন না। চা-বাগান এলাকায় দেখা গেছে, শ্রমিকরা আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করার চেষ্টা করছেন। শহরের ফুটপাত ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিন্নমূল মানুষদের কষ্ট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। শীতের রাতে খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষেরা ঠাণ্ডায় কাঁপছেন, অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

শীতের প্রভাব পড়েছে শ্রীমঙ্গলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতেও। সকালের দিকে দোকানপাট খুলতে দেরি হচ্ছে, বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে। পর্যটন শহর হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলে শীত মৌসুমে সাধারণত পর্যটকের চাপ বাড়ে, তবে তীব্র ঠাণ্ডা ও কুয়াশার কারণে অনেক পর্যটক ভ্রমণসূচি সংক্ষিপ্ত করছেন। সকালে কুয়াশার কারণে সড়ক যোগাযোগেও ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা স্থানীয় পরিবহন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।

শীতের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সিনতিয়া জানান, প্রতিদিন হাসপাতালে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, শীতের কারণে শ্বাসতন্ত্রের রোগ দ্রুত বাড়ে এবং ঠাণ্ডাজনিত জটিলতা দেখা দেয়। তাই সবাইকে গরম কাপড় ব্যবহার, শিশু ও বৃদ্ধদের বাড়তি যত্ন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, শীতের এই সময়ে ঠাণ্ডা লাগা থেকে শুরু করে নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি বা হৃদরোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও জরুরি। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লেও সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম দিয়ে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ডের জন্য পরিচিত। ঢাকা আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ইতিহাস বেশ পুরনো ও উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল মাত্র ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া ১৯৬৬ সালের ২৯ জানুয়ারি তাপমাত্রা নেমেছিল ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে। ২০০৩ সালের ২৩ জানুয়ারি ৫ ডিগ্রি, ২০০৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর ৫ দশমিক ২ ডিগ্রি এবং ১৯৯৫ সালের ৪ জানুয়ারি ও ২০০৭ সালের ১৭ জানুয়ারি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শ্রীমঙ্গলে শীত তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়। ভারতের ত্রিপুরা ও আসামের পাহাড়ি অঞ্চল সংলগ্ন হওয়ায় উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাস সহজেই এই এলাকায় প্রবেশ করে। পাশাপাশি চা-বাগান ও বনাঞ্চল থাকায় রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। চলতি মৌসুমে পশ্চিমা লঘুচাপ ও উত্তর দিক থেকে আসা শীতল বায়ুর প্রভাবের কারণেই শীতের তীব্রতা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতি বছরই শ্রীমঙ্গলে শীত পড়ে, তবে এবছর শীত যেন একটু বেশিই কনকনে। দীর্ঘদিন ধরে সূর্যের দেখা কম পাওয়া যাচ্ছে, কুয়াশা কাটতে দেরি হচ্ছে। গ্রামের মানুষজন সকালে মাঠে বা কাজে যেতে পারছেন না, শিশুরা স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতিও কমে গেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রীমঙ্গলের শীত নিয়ে নানা ছবি ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন স্থানীয়রা। ঘন কুয়াশায় ঢাকা চা-বাগান, শিশিরে ভেজা পাতা আর আগুন পোহানো মানুষের ছবি ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইনে। এসব ছবি একদিকে শীতের সৌন্দর্য তুলে ধরলেও অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কষ্টের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শীতের এই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। শীতবস্ত্র বিতরণ, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র চালু এবং স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো গেলে শীতজনিত দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন, যাতে মানুষ শীতের ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারে।

সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গলে তীব্র শীত এখন শুধু আবহাওয়ার খবর নয়, এটি জনজীবন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। কনকনে ঠাণ্ডায় প্রতিদিনের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন এই অঞ্চলের মানুষ। সামনে তাপমাত্রা আরও কমবে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। তবে আপাতত শীতের এই দাপটে শ্রীমঙ্গলের মানুষকে সতর্ক ও সহনশীল থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত