টমেটো চাষে ভাগ্যবদল, শিবগঞ্জে স্বাবলম্বীতার দৃষ্টান্ত জজম আলী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৪ বার

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাকরির পেছনে অনিশ্চিত দৌড় নয়, নিজের মেধা, সাহস ও পরিশ্রমকে সঙ্গী করে কৃষিকাজেই স্বপ্নের ভবিষ্যৎ গড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা জজম আলী। মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পরও সরকারি বা বেসরকারি চাকরির খোঁজে না ছুটে তিনি বেছে নিয়েছেন আধুনিক কৃষি। ৪২ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে টমেটো চাষ করে ইতোমধ্যেই স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। চলতি মৌসুমে প্রায় ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ৪০ লাখ টাকা মুনাফা অর্জনের দৃঢ় প্রত্যাশা তার।

শিবগঞ্জ উপজেলার এক বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা টমেটোর খেতে সরেজমিন গেলে চোখে পড়ে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। থোকায় থোকায় ঝুলছে কাঁচা ও পাকা টমেটো। সবুজ গাছের ফাঁকে ফাঁকে লাল রঙের টমেটোর সমারোহ যেন প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাস। সেই ক্ষেতের মাঝেই ব্যস্ত সময় পার করছেন জজম আলী। কথা হয় তার সঙ্গে। মুখে আত্মবিশ্বাসের হাসি, চোখে পরিশ্রমের তৃপ্তি।

জজম আলী বলেন, মাস্টার্স পাস করার পর চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চাকরি পেতে গেলে মামা-খালু বা বড় অঙ্কের টাকা প্রয়োজন। সেই পথে না গিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেই। আমি বিশ্বাস করি, কৃষি যদি আধুনিকভাবে করা যায়, তাহলে সেটাই হতে পারে সবচেয়ে সম্মানজনক ও লাভজনক পেশা। এই বিশ্বাস থেকেই কৃষিকাজে নামা।

তিনি জানান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করে এবং আরও চারজন তরুণ কৃষকের সঙ্গে আলোচনা করে বাণিজ্যিকভাবে টমেটো চাষের পরিকল্পনা নেন। এরপর বছরে বিঘাপ্রতি ১৯ হাজার টাকা দরে মোট ৪২ বিঘা জমি লিজ নেন। জমি প্রস্তুত, উন্নত জাতের চারা কেনা, চারা রোপণ, মাচা তৈরি, সার ও কীটনাশক ব্যবহারসহ সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞে শুধু নিজের স্বপ্ন নয়, আরও অনেকের জীবিকাও যুক্ত করেছেন জজম আলী। প্রতিদিন তার টমেটোর জমিতে কাজ করছেন প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন যুবক। প্রত্যেকে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন। ফলে এই প্রকল্প স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক যুবক যারা আগে বেকার ছিলেন, এখন নিয়মিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন এই খামারে কাজ করে।

জজম আলী বলেন, গত অক্টোবর মাসে জমি চাষ শেষ করে টমেটোর চারা রোপণ করি। মাত্র দুই মাসের মধ্যেই গাছে ফলন আসতে শুরু করে। ডিসেম্বর মাস থেকে টমেটো তোলা ও বিক্রি শুরু করি। গত দেড় মাসেই প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ লাখ টাকার টমেটো বিক্রি হয়েছে। খরচের পুরো টাকাই ইতোমধ্যে উঠে এসেছে। এখন থেকে যা বিক্রি হবে, সেটাই লাভ।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সামনে আরও প্রায় দুই মাস টমেটো সংগ্রহ করা যাবে বলে আশা করছেন তিনি। তার হিসাব অনুযায়ী, মৌসুম শেষে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন সম্ভব। এই সাফল্য তার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে টমেটোর পাশাপাশি অন্যান্য সবজি ও ফল চাষে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তার।

কথার ফাঁকে তিনি বর্তমান সমাজ বাস্তবতা নিয়েও নিজের ভাবনার কথা জানান। জজম আলী বলেন, শিক্ষিত বেকার যুবকরা অনেক সময় শুধু চাকরির পেছনে ছোটে। চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। সেই হতাশা থেকে কেউ কেউ ভুল পথে চলে যায়, মাদকাসক্ত হয়ে জীবন ধ্বংস করে ফেলে। অথচ আমাদের এলাকার জমি এত উর্বর যে, পরিকল্পনা করলে যেকোনো ফসল চাষ করে ভালো ফলন পাওয়া যায়। কৃষিকাজে শুধু আয় নয়, মানসিক শান্তি আর সৎ জীবনযাপনের সুযোগও আছে।

সরেজমিন দেখা যায়, তার টমেটোর জমিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো গাছে ঝুলছে টমেটো। কোথাও কাঁচা সবুজ, কোথাও টকটকে লাল। শ্রমিকরা কেউ ফল সংগ্রহ করছেন, কেউ বাছাই করছেন, কেউ আবার বাজারজাতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পুরো এলাকা যেন এক জীবন্ত কর্মযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরছে। স্থানীয় অনেক মানুষই প্রতিদিন এই ক্ষেত দেখতে আসেন, অনুপ্রাণিত হন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মিয়া জজম আলীর উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হয়েছে। জজম আলীর মতো তরুণ উদ্যোক্তার টমেটোর জমি ঘুরে আমি সত্যিই আনন্দিত। তিনি আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করছেন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণে ভালো ফলন পাচ্ছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তাকে সব ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

নয়ন মিয়া আরও জানান, বর্তমানে শিবগঞ্জে অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক টমেটো চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কারণ টমেটো একটি স্বল্পমেয়াদি ফসল এবং সঠিক সময়ে বাজারজাত করতে পারলে অল্প সময়েই ভালো মুনাফা অর্জন সম্ভব। জজম আলীর সাফল্য অন্য তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।

স্থানীয়দের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্যও আশাব্যঞ্জক। শিক্ষিত তরুণরা যদি কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন বাড়বে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসবে।

জজম আলীর গল্প প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর সাহস থাকলে কৃষিই হতে পারে সবচেয়ে শক্ত ভিত্তির ক্যারিয়ার। চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের গ্রাম, নিজের জমিতেই যে স্বপ্নের ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব, তা নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছেন শিবগঞ্জের এই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত