প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা এক সময় ছিল প্রাচীন সভ্যতা, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও জনপদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইতিহাসের পাতায় যার অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে চিহ্নিত, আজ সেই নবাবগঞ্জেই ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনা, ঢিবি ও পুরাকীর্তি কালের বিবর্তনে যেমন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, তেমনি সংরক্ষণের অভাবে অনেক নিদর্শন ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে চিরতরে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নবাবগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে এখনও দৃশ্যমান রয়েছে বহু ঐতিহাসিক স্থান, যেগুলোর অধিকাংশই অযত্ন আর অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। কোথাও ভেঙে পড়ছে দেয়াল, কোথাও দখল হয়ে যাচ্ছে ঢিবি, আবার কোথাও চাষের জমিতে রূপ নিচ্ছে সম্ভাবনাময় প্রত্নস্থল। স্থানীয়ভাবে এসব স্থান নিয়ে আগ্রহ থাকলেও কার্যকর কোনো সংরক্ষণ উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
নবাবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের সীতাকোট বৌদ্ধ বিহার। এক সময় এটি ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় ও শিক্ষা কেন্দ্র বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে সেই বিহারের অবশিষ্ট অংশ মাটি আর ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়ে আছে। একই ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা পুরোনো ইট আর কাঠামোর ভগ্নাংশ আজ কেবল নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অতীত গৌরবের।
মাহমুদপুর ইউনিয়নের দারিয়ায় অবস্থিত অরুনধাপ বা বেহুলার বাপের বাড়ি ঢিবি এবং বেহুলার বাসরঘর ঢিবি স্থানীয় লোককথা ও ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব ঢিবি ঘিরে নানা কাহিনি প্রচলিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢিবিগুলো সমতল হয়ে যাচ্ছে। কোথাও মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার বসতি বা চাষাবাদের কারণে ঢিবির অস্তিত্ব প্রায় নিশ্চিহ্ন।
নবাবগঞ্জের হরিনাথপুর দুর্গ এক সময়ের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামোর নিদর্শন হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে দুর্গের প্রাচীরের ভগ্নাংশ ছাড়া আর তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। একইভাবে হলাইজানা তেলিপাড়া মসজিদ, দাউদপুর ইউনিয়নের জিগাগড় দুর্গ, পুটিমারা ইউনিয়নের টঙ্গী ঢিবি, দলার দরগা মঠ এবং ভাদুরিয়া ইউনিয়নের নিশা পলাশবাড়ী মঠও আজ বিলুপ্তির পথে। এসব স্থাপনার অনেকগুলোই এখন স্থানীয়দের কাছে সাধারণ জমি বা পরিত্যক্ত স্থানে পরিণত হয়েছে।
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, নবাবগঞ্জ অঞ্চলটি এক সময় ছিল প্রাচীন একটি সমৃদ্ধ জনপদ এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র। দিনাজপুর জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক আবুল কালাম যাকারিয়া একাধিকবার এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, পুরো এলাকা জুড়ে ছিল বৌদ্ধ বিহার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং বসতবাড়ির নিদর্শন। বাংলাদেশ প্রত্ন সম্পদ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক আব্দুল আজিজ নবাবগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে লেখা তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এই অঞ্চলের মাটির নিচে এখনও অসংখ্য প্রত্নসম্পদ লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশ প্রত্ন সম্পদ গ্রন্থ অনুযায়ী, উপজেলার মাহমুদপুর এলাকায় ১৯৬০ সালের আগে মোট ঢিবির সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০টি। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে, ১৯৬৭ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫১টিতে। পরবর্তী কয়েক দশকে আরও অনেক ঢিবি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। দখল, অবৈধ মাটি কাটা, ইটভাটার কাঁচামাল সংগ্রহ এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন এসব ঢিবি ধ্বংসের প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়।
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নবাবগঞ্জ এলাকায় পরীক্ষামূলক খনন চালায়। খননের সময় দেখা যায়, বগুড়ার লখিন্দরের ঢিবির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি ঢিবির তলদেশে বিদ্যমান। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে সেখানে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলেও পরবর্তী সময়ে বড় পরিসরে খনন বা সংরক্ষণের উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি। ফলে স্থানটি আবারও অবহেলার অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
দাউদপুর ইউনিয়নের খয়েরগনি নামক স্থানে ২০০৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি খনন দল কাজ শুরু করে। খননের সময় সেখানে একটি বৌদ্ধ বিহারের স্থাপনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে গবেষকেরা মনে করেন। তবে অর্থের অভাবে সেই খনন কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সেই স্থাপনাটি আবারও মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে, অযত্ন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও গবেষণা করা গেলে নবাবগঞ্জের ইতিহাস নতুনভাবে আলোকিত হতে পারে। একই সঙ্গে এসব স্থাপনা ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকরা এখানে আসতে পারেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
নবাবগঞ্জের অনেক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, তারা ছোটবেলা থেকে এসব ঢিবি ও স্থাপনার গল্প শুনে এসেছেন। কিন্তু এখন নিজের চোখের সামনে সেগুলো ধ্বংস হতে দেখছেন। কেউ কেউ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সময়মতো উদ্যোগ নিলে হয়তো এত বড় ক্ষতি হতো না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবও এই ধ্বংসের জন্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও এখানে জরুরি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গবেষণা, খনন এবং সংরক্ষণের পাশাপাশি এসব স্থানকে কেন্দ্র করে ইতিহাসচর্চা বাড়াতে হবে।
নবাবগঞ্জের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অতীত এখনও অনেক কিছু বলার অপেক্ষায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি সেই সুযোগ হারিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর কখনোই জানতে পারবে না তাদের শেকড়ের ইতিহাস। তাই এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। নয়তো নবাবগঞ্জের প্রাচীন নিদর্শন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ স্মৃতিতে পরিণত হবে।