প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হাওর, পাহাড়বেষ্টিত ও চা–বাগানে ঘেরা মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল টানা চার দিন ধরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড ধরে রেখেছে। শীতপ্রবণ এই অঞ্চলে জানুয়ারির শেষভাগে এমন ধারাবাহিক নিম্ন তাপমাত্রা নতুন করে শীতের উপস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো, দিনের বেলা রোদের তীব্রতার কারণে শীতের কাঁপুনি ততটা অনুভূত হচ্ছে না। সকাল ও রাতের দিকে শীতের প্রকোপ থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকটাই সহজ হয়ে উঠছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরে সকাল ৯টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আগের দিন সোমবার সকাল ৬টায় তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সকাল ৯টায় নেমে আসে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। একইভাবে রবিবার ও শনিবার সকালেও শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ থেকে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। টানা চার দিন ধরে এমন নিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করায় আবহাওয়াবিদদের নজর পড়েছে এই অঞ্চলের ওপর।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক রাকিবুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলে শীত মৌসুমে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। তবে এবার জানুয়ারির শেষভাগে এসে টানা কয়েক দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এখানে রেকর্ড হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, সকাল ও সন্ধ্যায় ঠাণ্ডা বেশি অনুভূত হলেও দিনের বেলা সূর্যের তাপে সেই শীত অনেকটাই কমে যায়। আগামী কয়েক দিন তাপমাত্রা প্রায় একই রকম থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভোরবেলা হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
শ্রীমঙ্গল মূলত চা–বাগান, বনাঞ্চল ও জলাভূমি পরিবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। পাহাড়ি ঢল, বিস্তীর্ণ সবুজ বন এবং জলাশয়ের প্রভাব তাপমাত্রা কম রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। শীত মৌসুমে এই এলাকাকে অনেক সময় দেশের ‘শীতল রাজধানী’ বলেও উল্লেখ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এমন তাপমাত্রা খুব একটা অস্বাভাবিক না হলেও, টানা কয়েক দিন ধরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়া বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় চা–শ্রমিকরা জানান, সকালে কাজে বের হতে শীতের কারণে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ভোরের দিকে কুয়াশা থাকায় চা–বাগানে কাজ শুরু করতে দেরি হয়। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো ও তাপ কাজে গতি ফিরিয়ে আনে। একজন চা–শ্রমিক বলেন, সকালে হাত-পা ঠাণ্ডায় জমে যায়, কিন্তু দুপুরের দিকে রোদে কাজ করতে আর তেমন কষ্ট হয় না।
শহরের সাধারণ মানুষও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অনেকেই সকালে গরম কাপড় পরে বের হলেও দুপুরের দিকে তা আর প্রয়োজন হয় না। শীতের এই বৈপরীত্যপূর্ণ আচরণ শিশু ও বয়স্কদের জন্য কিছুটা ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন। হঠাৎ ঠাণ্ডা ও উষ্ণতার তারতম্যে সর্দি, কাশি, জ্বরসহ মৌসুমি অসুখ বাড়তে পারে। তাই তারা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
এদিকে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন খাতেও শীতের এই আবহাওয়া ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। চা–বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও বিভিন্ন পর্যটন স্পটে শীতের সকালে কুয়াশা আর দুপুরের রোদে সবুজের ঝলক পর্যটকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। কয়েকজন পর্যটক জানান, সকালে হালকা কুয়াশার মধ্যে চা–বাগানের দৃশ্য যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনি দুপুরের রোদে প্রকৃতি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শীত মৌসুমের শেষ দিকে এসে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এমন নিম্ন তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে। তবে বড় ধরনের শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা আপাতত নেই। বরং দিনের বেলা রোদের আধিক্যের কারণে তাপমাত্রার পার্থক্য স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। এটি আবহাওয়ার স্বাভাবিক একটি ধাপ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি সংশ্লিষ্টরাও এই তাপমাত্রার দিকে নজর রাখছেন। শীতকালীন সবজি চাষের জন্য এমন আবহাওয়া সাধারণত সহায়ক হলেও অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ফসলের ক্ষতি করতে পারে। তবে শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা এখনো সেই মাত্রায় নামেনি, যা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত কৃষকদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই, তবে আবহাওয়ার গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গলে টানা চার দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করলেও তা জনজীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি। সকাল ও রাতের ঠাণ্ডা আর দিনের বেলার রোদের সমন্বয়ে একটি বৈচিত্র্যময় শীতের চিত্র ফুটে উঠেছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনও একই ধরনের তাপমাত্রা থাকতে পারে। তাই শীতের এই শেষ সময়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলার পাশাপাশি প্রকৃতির এই রূপ উপভোগ করছেন শ্রীমঙ্গলবাসী ও পর্যটকেরা।