নীতি সুদ ১০ শতাংশই থাকছে, অবসায়নে ৬ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৫ বার
নীতি সুদ ১০ শতাংশই থাকছে, অবসায়নে ৬ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে নীতি সুদের হার ১০ শতাংশেই বহাল থাকছে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।

মুদ্রানীতির এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও শিল্পখাত প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় নীতি সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারত, তবে তা বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলত। আবার সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার ঝুঁকি ছিল। এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থান নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদের হার স্থির রাখার পথ বেছে নিয়েছে।

বোর্ড সভায় মুদ্রানীতি ছাড়াও আর্থিক খাত সংস্কার ও শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স-২০২৫’-এর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত ৯টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬টিকে অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করার চূড়ান্ত অনুমোদন। বাকি ৩টি প্রতিষ্ঠানকে সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য আরও তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডের অনুমোদনের ফলে এখন থেকে সংশ্লিষ্ট ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা, লিকুইডেটর নিয়োগ, তাদের সম্পদ বিক্রি এবং সেই অর্থ পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ এবং সুশাসনের অভাব আর্থিক খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। তাই কঠোর হলেও এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যাতে সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরে আসে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই ৯টি সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে মোট আটকে থাকা আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ গ্রাহকদের আমানত প্রায় ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং ব্যাংক ও করপোরেট আমানত প্রায় ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকায় হাজার হাজার গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। অনেক আমানতকারী তাদের সঞ্চয়ের টাকা ফেরত না পেয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অবসায়নের সিদ্ধান্ত পাওয়া ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো—এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার অবনতি এতটাই গভীর যে, স্বাভাবিক ব্যবসা কার্যক্রমে ফিরে আসার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে শেষ সুযোগ হিসেবে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা যদি কার্যকর পুনর্গঠন পরিকল্পনা দেখাতে পারে, তাহলে অবসায়ন এড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত একদিকে কঠোর হলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানী ও অনিয়মগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকলে পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও দুর্বল হয়ে যায়। তবে একই সঙ্গে তারা জোর দিচ্ছেন, অবসায়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করতে হবে। দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পদ বিক্রি করে যতটা সম্ভব আমানত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা না হলে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।

বোর্ড সভায় আসন্ন মুদ্রানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৮ শতাংশ। বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও ঋণ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কর্মকর্তাদের মতে, অতিরিক্ত ঋণ প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে, আবার খুব কম ঋণ প্রবৃদ্ধি হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মাঝামাঝি একটি লক্ষ্যমাত্রা ধরে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তে ব্যাংক খাতও আপাতত স্বস্তি পাচ্ছে। কারণ, সুদের হার বাড়লে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় আরও বাড়ত, যা ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করত। আবার সুদের হার কমানো হলে আমানত সংগ্রহে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এই অবস্থায় নীতি সুদের হার স্থির রাখায় ব্যাংকগুলো তাদের বর্তমান ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কিছুটা স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে নিতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই সিদ্ধান্তের সুফল যেন কেবল নীতিপত্রেই সীমাবদ্ধ না থাকে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য মুদ্রানীতির পাশাপাশি কার্যকর রাজস্ব ও কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি। অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একক উদ্যোগে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; সরকারের অন্যান্য নীতিগত পদক্ষেপের সঙ্গেও মুদ্রানীতির সমন্বয় প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে বহাল রাখা এবং দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। এই পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর। আগামী মাসগুলোতে এই সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব দেশের আর্থিক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত