চট্টগ্রামে দুই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী চাপে নির্বাচনী সমীকরণ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মাঠ ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দুটি সংসদীয় আসনে বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসায় নির্বাচনী সমীকরণ জটিল আকার ধারণ করেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির তিন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে বহিষ্কারাদেশ কার্যকর থাকলেও তারা এখনো মাঠ ছাড়েননি। ফলে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের জন্য বিদ্রোহী প্রার্থীরা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-১৬ আসন বাঁশখালীতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। তিনি বিএনপির সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে হওয়ায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তার মনোনয়ন অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। তবে এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। সেই অসন্তোষ থেকেই দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ইউপি চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামেন।

জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ধরে বাঁশখালী বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন লেয়াকত আলী। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাকে এই আসনের স্বাভাবিক দাবিদার হিসেবে দেখতেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে মিশকাতুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়ার পর লেয়াকত আলী দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হন। এর পরপরই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও নির্বাচনী মাঠে তার উপস্থিতি বিএনপির ভোটব্যাংকে বিভাজনের শঙ্কা তৈরি করেছে।

বর্তমান পদধারী নেতারা প্রকাশ্যে লেয়াকত আলীর পক্ষে অবস্থান না নিলেও তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী তার হয়ে নীরবে প্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জামায়াতের প্রার্থীর পাশাপাশি বিদ্রোহী লেয়াকত আলী বিএনপির জন্য দ্বিমুখী চাপে পরিণত হয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৪ আসন চন্দনাইশ ও আংশিক সাতকানিয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল। এই আসনে একসঙ্গে দুইজন বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন শফিকুল ইসলাম রাহী এবং অ্যাডভোকেট মিজানুল হক চৌধুরী। এই আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন জসিম উদ্দিন চৌধুরী। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সক্রিয় থাকা নেতাদের উপেক্ষা করে কেন্দ্র থেকে প্রার্থী নির্ধারণ করায় এই বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছে। শফিকুল ইসলাম রাহী এবং মিজানুল হক চৌধুরী দুজনই নিজ নিজ অবস্থান থেকে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। তাদের সমর্থকদের দাবি, দলীয় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা না হওয়ায় তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

এই আসনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী উপস্থিতিতে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ওমর ফারুক জোট প্রার্থী হিসেবে এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে বিএনপির দলীয় প্রার্থী স্বতন্ত্র দুই বিদ্রোহী এবং জোট প্রার্থীর উপস্থিতিতে ভোটের হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

এদিকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে ভিন্ন ধরনের সমীকরণ তৈরি হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফকে সমর্থন জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আবু নাসের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় ব্যালটে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক থেকে গেছে। এতে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যদিও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা সরাসরি নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিচ্ছেন না তবে দলের সাধারণ কর্মীরা নিয়মিত মাঠে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়ে এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তার দাবি, আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে জামায়াত পুরোপুরি সরে দাঁড়ায়নি।

জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাসের এ প্রসঙ্গে বলেন, ভোটাররা যাকে ভোট দেবেন সেটি তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি এবং কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচার চালাচ্ছি না। তবে ব্যালটে প্রতীক থাকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক তিনি এড়িয়ে যান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের এই আসনগুলোতে বিদ্রোহী প্রার্থী ও প্রতীকগত জটিলতা সরাসরি নির্বাচনী ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির ক্ষেত্রে দলীয় ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কৌশলগতভাবে কিছু ভোট ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দরকষাকষিতে তা কাজে লাগাতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের নির্বাচনী মাঠে দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙন বিদ্রোহী প্রার্থী আর কৌশলগত ছাড়ের রাজনীতি এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন সমীকরণকে প্রাধান্য দেন সেটিই নির্ধারণ করবে এই আসনগুলোর ভাগ্য। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই নির্বাচন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর লড়াই নয়, বরং দলগুলোর ভেতরের ঐক্য ও নেতৃত্বের পরীক্ষাও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত