জামায়াতের ইশতেহারে ‘৫টিতে হ্যাঁ, ৫টিতে না’: স্পষ্ট রাজনীতির ঘোষণা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভিন্নধর্মী ও প্রতীকী কাঠামোয় নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রচলিত দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির তালিকার বাইরে গিয়ে দলটি এবার তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে উপস্থাপন করেছে ‘৫টিতে হ্যাঁ’ এবং ‘৫টিতে না’—এই দুই ধারণার মাধ্যমে। রাজনীতিতে কোন বিষয়গুলোতে তারা আপসহীনভাবে সমর্থন জানায় এবং কোন বিষয়গুলো তারা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে, তা এক নজরেই বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে এই কাঠামোয়।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যার পর রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। দলটির শীর্ষ নেতারা, নির্বাচনি প্রার্থী, সমর্থক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ইশতেহারের মূল দর্শন তুলে ধরা হয়। ঘোষণার শুরুতেই জামায়াত নেতারা জানান, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণ আর অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি বা কূটনৈতিক ভাষা শুনতে চায় না; তারা জানতে চায় একটি রাজনৈতিক দল আসলে কী চায় এবং কী চায় না। সেই চাহিদা থেকেই ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর এই দ্বৈত কাঠামো।

ইশতেহারের প্রথম অংশে ‘হ্যাঁ’ শব্দটির মাধ্যমে জামায়াত তাদের ইতিবাচক রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলো তুলে ধরেছে। এখানে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোকে সামনে আনা হয়েছে। দলটির মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতির সংস্কৃতির ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতা ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সেই বাস্তবতায় সততাকে তারা রাজনীতির মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একই সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভাজন ও সংঘাত কমিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

ইনসাফ বা ন্যায়বিচারকে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে আইনের শাসন ও সমতার নীতি কার্যকর না হলে গণতন্ত্র টেকসই হয় না। দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহারে বলা হয়েছে, কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের প্রধান মানদণ্ড করা হবে। পাশাপাশি তরুণ সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইশতেহারের দ্বিতীয় অংশে ‘না’ শব্দটির মাধ্যমে দলটি তাদের আপসহীন অবস্থানগুলো তুলে ধরেছে। এখানে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান জানানো হয়েছে। জামায়াত নেতারা বলেন, দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ধ্বংসের প্রধান কারণ। তাই ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির কথা বলা হয়েছে।

ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরোধিতার প্রসঙ্গে ইশতেহারে বলা হয়, রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন, ভোটাধিকার হরণ কিংবা প্রশাসনকে দলীয়করণ—এই প্রবণতাগুলো গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। জামায়াত দাবি করেছে, তারা এমন রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে যেখানে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

ইশতেহার ঘোষণার মঞ্চসজ্জা ও ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনাও ছিল এই ‘হ্যাঁ-না’ দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মঞ্চের নকশায় বড় অক্ষরে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ শব্দ দুটি আলাদাভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। ব্যানার, আলো ও গ্রাফিক্সে এই প্রতীকী বার্তা উপস্থিত ছিল, যা ইশতেহারের বক্তব্যকে আরও দৃশ্যমান ও স্মরণযোগ্য করে তোলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা আধুনিক রাজনৈতিক প্রচারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তরুণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ইশতেহার ঘোষণার পর জামায়াতের নেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এই কাঠামোর মাধ্যমে তারা জনগণের সঙ্গে একটি সরল ও সৎ রাজনৈতিক চুক্তি করতে চায়। কোন বিষয়ে তারা আপস করবে না এবং কোন বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে—তা আগেভাগেই জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ না ওঠে। তাদের ভাষায়, এটি কেবল নির্বাচনি কৌশল নয়; বরং একটি নীতিগত অবস্থান।

রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ইশতেহার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ একে সংক্ষিপ্ত ও বার্তাবহুল উপস্থাপনা হিসেবে প্রশংসা করছেন, আবার কেউ বলছেন—বাস্তবায়নের প্রশ্নে এসব অবস্থান কতটা কার্যকর হবে, সেটাই মূল বিবেচ্য। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ‘৫টিতে হ্যাঁ, ৫টিতে না’—এই ধারণা জামায়াতের ইশতেহারকে অন্যান্য দলের প্রচলিত ইশতেহার থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

নির্বাচনি মাঠে যখন নানা প্রতিশ্রুতি, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা চলছে, তখন জামায়াতের এই ইশতেহার তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন বার্তাকে গুরুত্ব দেবেন, তা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট হবে। তবে এই ইশতেহার যে রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে, সে বিষয়ে একমত অনেকেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত