প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে প্রাথমিক পর্ব শেষ করল বাংলাদেশ। স্বাগতিক নেপালকে ৪-০ গোলে হারিয়ে রাউন্ড রবিন লিগের সবগুলো ম্যাচ জিতে টেবিলের শীর্ষে থেকেই ফাইনালে উঠেছে লাল-সবুজের কিশোরীরা। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ফুটবল, আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং শৃঙ্খলিত রক্ষণভাগের সমন্বয়ে বাংলাদেশ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত।
পোখারা রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ। ম্যাচের প্রথম দিকেই আক্রমণ সাজিয়ে নেপালের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে মেয়েরা। সেই চাপের ফল আসে দ্রুতই। ম্যাচের শুরুতেই প্রতিমা মুন্দার গোলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। এই গোল নেপাল শিবিরে মানসিক ধাক্কা দেয় এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে চলে আসে। প্রথম গোলের পরও আক্রমণের ধার কমায়নি দল। মাঝমাঠে বল দখলে রেখে একের পর এক আক্রমণ চালায় বাংলাদেশ।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামেন আলপি আক্তার। মাঠে নেমেই নিজের গতিময়তা ও নিখুঁত টেকনিকে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। একাধিক আক্রমণে সরাসরি ভূমিকা রেখে নেপালের রক্ষণভাগকে বারবার ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন এই তরুণ ফুটবলার। তার প্রাণবন্ত পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ আরও তিনটি গোল পায়। আলপি আক্তারের নৈপুণ্যেই মূলত ম্যাচটি একপেশে হয়ে ওঠে। অসাধারণ খেলায় ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।
নেপালের বিপক্ষে এই জয় কেবল একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়, বরং পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রতিচ্ছবি। এর আগে প্রাথমিক পর্বে শক্তিশালী ভারতকে ২-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে রক্ষণে দৃঢ়তা ও আক্রমণে কার্যকারিতা ফুটে ওঠে স্পষ্টভাবে। এরপর ভুটানের বিপক্ষে ১২-০ গোলের বিশাল জয় আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তিন ম্যাচে তিন জয়, মোট ১৮ গোল এবং মাত্র শূন্য গোল হজম—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় বাংলাদেশ কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে এই আসরে।
রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে আয়োজিত টুর্নামেন্টে প্রতিটি দল একে অপরের বিপক্ষে মুখোমুখি হয়। এই পদ্ধতিতে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে উতরে গেছে। তিন ম্যাচ শেষে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে থেকে ফাইনালে ওঠে দলটি। অন্যদিকে ৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থেকে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে ভারত।
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী দলের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রক্রিয়া। বয়সভিত্তিক ফুটবলে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ যে বিনিয়োগ করেছে, তার ফলাফল এখন স্পষ্ট। কোচিং স্টাফের কৌশলগত পরিকল্পনা, খেলোয়াড়দের শারীরিক ফিটনেস এবং মানসিক দৃঢ়তা মাঠে প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচে দল হিসেবে খেলার মানসিকতা দেখা যাচ্ছে, যা এই বয়সী ফুটবলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মেয়েরা শুধু ফলের দিক থেকেই নয়, খেলার ধরন দিয়েও আলাদা করে নজর কেড়েছে। বল দখলে রেখে ছোট পাসে খেলা, উইং ব্যবহার করে আক্রমণ এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত গোলের চেষ্টা—এই আধুনিক ফুটবলের ছাপ স্পষ্ট। একই সঙ্গে রক্ষণভাগে শৃঙ্খলা বজায় রেখে প্রতিপক্ষকে খুব বেশি সুযোগ না দেওয়ার প্রবণতাও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
নেপালের বিপক্ষে ম্যাচে গ্যালারিতেও ছিল বাড়তি উত্তেজনা। স্বাগতিক দর্শকদের চাপের মধ্যেও বাংলাদেশ মেয়েরা দারুণ ঠাণ্ডা মাথায় খেলে গেছে। প্রতিটি গোলের পর দলগত উদযাপন যেন আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি, তবে সেই হাসির আড়ালেই ছিল ফাইনালের প্রস্তুতির বার্তা।
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত। প্রাথমিক পর্বে ভারতকে হারালেও ফাইনাল ম্যাচ সবসময় আলাদা মাত্রা নিয়ে আসে। দুই দলের মধ্যে ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শিরোপার চাপ এবং দর্শকদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়দের বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নেই। তারা মনে করছেন, নিজেদের পরিকল্পনায় অটল থাকতে পারলে শিরোপা জেতা সম্ভব।
বাংলাদেশ নারী ফুটবলের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় এই ফাইনাল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্য ভবিষ্যতে সিনিয়র দলের জন্য শক্ত ভিত গড়ে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তরুণ ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিজ্ঞতা অর্জন দেশের নারী ফুটবলের মান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
দেশের ক্রীড়ামোদী মানুষের মধ্যেও এই সাফল্য নতুন করে আশা জাগিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের মেয়েদের প্রশংসায় ভাসছেন সমর্থকরা। অনেকেই বলছেন, এই দলই আগামী দিনে দেশের ফুটবলের মুখ উজ্জ্বল করবে। বিশেষ করে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে এমন পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
সবকিছু মিলিয়ে নেপালকে ৪-০ গোলে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা শুধু একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের নারী ফুটবলের আত্মবিশ্বাসী উত্থানের আরেকটি প্রমাণ। এখন সবার দৃষ্টি ফাইনালের দিকে। ৭ ফেব্রুয়ারি মাঠে নামবে বাংলাদেশ ও ভারত। সেই ম্যাচে লাল-সবুজের মেয়েরা শিরোপা ছিনিয়ে আনতে পারে কি না, সেটিই এখন দেশের ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা।