প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নানা নাটকীয়তা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ক্রিকেটীয় উত্তেজনার মধ্য দিয়ে আগামীকাল শনিবার পর্দা উঠতে যাচ্ছে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসরের। ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য ২০ দলের এই বৈশ্বিক ক্রিকেট মহাযজ্ঞ শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ। দীর্ঘদিন ধরেই ক্রিকেটবিশ্বে সবচেয়ে হাইভোল্টেজ ম্যাচ হিসেবে পরিচিত এই দ্বৈরথ ঘিরে দর্শক, সম্প্রচার সংস্থা ও আয়োজকদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে সেই প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা দেয় পাকিস্তানের বয়কট ঘোষণা।
বাংলাদেশকে রাজনৈতিক কারণে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ ও সংহতি জানিয়ে পাকিস্তান সরকার ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্রুপপর্বে ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচটি না খেলার সিদ্ধান্ত জানায়। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতই। এতে বিশ্বকাপের উত্তাপ যেমন বেড়ে যায়, তেমনি আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কা ও বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থা আইসিসির উদ্বেগও তীব্র হয়।
পাকিস্তানের এই ঘোষণার পরপরই বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক ও ক্রীড়া অঙ্গনে শুরু হয় তৎপরতা। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড সরাসরি পাকিস্তানকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কলম্বো থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এসএলসি জানায়, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট শুধু ক্রিকেটীয় ক্ষতিই নয়, শ্রীলঙ্কার জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বিপুল সংখ্যক দর্শক, আন্তর্জাতিক পর্যটক, টেলিভিশন দর্শক এবং বিজ্ঞাপন ও সম্প্রচারস্বত্ব থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব। এই ম্যাচ বাতিল হলে বা না হলে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট বোর্ডের আয়, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পর্যটন খাত। ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় থাকা দেশটির জন্য এমন ধাক্কা নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে তারা।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি’র এক প্রতিবেদনে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, যেকোনো ধরনের অনুপস্থিতি বা ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে আয়োজক বোর্ডের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি এবং প্রত্যাশিত পর্যটক প্রবাহ হারানোর ঝুঁকি। দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, ক্রিকেটপ্রেমীদের উন্মাদনা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনা করে পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পাকিস্তানের ঘোষণার পর থেকেই আইসিসিও বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থাটি সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক অবস্থানে না গিয়ে শুরু থেকেই নমনীয় সুরে আলোচনা চালাচ্ছে। আইসিসির পক্ষ থেকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং ভারত–পাকিস্তান ম্যাচটি মাঠে গড়ানোর জন্য কূটনৈতিক পর্যায়েও দরজার আড়ালে চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। এমনকি বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করে দুই পক্ষের মধ্যে সমাধানের পথ খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এখনো পর্যন্ত পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আইসিসিকে আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি। সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত জানানো হলেও আইসিসির কাছে লিখিত অবস্থান না আসায় বিষয়টি ঝুলে আছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই বিলম্ব কৌশলগতও হতে পারে, যাতে শেষ মুহূর্তে আলোচনার মাধ্যমে সুবিধাজনক কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়।
এই বিশ্বকাপের সূচি অনুযায়ী উদ্বোধনী দিনেই অন্যতম আয়োজক ভারত নিজেদের মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হবে। একই দিনে কলম্বোতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাঠে নামবে পাকিস্তান। পুরো টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের সব ম্যাচই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা শ্রীলঙ্কায়। এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের সঙ্গে গ্রুপপর্বের বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি ছিল কলম্বোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সেই ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা এলেও বাস্তবতা হলো, দুই দলই সেমিফাইনাল বা ফাইনালে উঠলে আবারও মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, সেমিফাইনাল বা ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে পড়লে তখন আবারও সরকারের দ্বারস্থ হবে পিসিবি। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এর আগেও রাজনৈতিক কারণে নেওয়া বয়কটের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন করেছে পাকিস্তান। ফলে বর্তমান সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় তারা ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতেই ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হলেও ক্রীড়াঙ্গনের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত আসে, তা সময়ই বলে দেবে।
ক্রিকেটপ্রেমীদের বড় একটি অংশ মনে করছে, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ ছাড়া টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আবেদন অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে। এই ম্যাচ ঘিরেই সাধারণত বিশ্বকাপের উত্তেজনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে টেলিভিশন রেটিং—সবখানেই এই ম্যাচের প্রভাব অনস্বীকার্য। ফলে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের উদ্বেগ শুধু তাদের নিজস্ব নয়, পুরো টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক সফলতার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সব মিলিয়ে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগমুহূর্তে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে তৈরি হওয়া এই অনিশ্চয়তা ক্রিকেটের বাইরেও বড় বার্তা দিচ্ছে। খেলাধুলা, রাজনীতি ও অর্থনীতির জটিল সম্পর্ক আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে এই ঘটনায়। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে, নাকি আন্তর্জাতিক চাপ ও ক্রীড়াঙ্গনের স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত বদলায়—সে দিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো ক্রিকেটবিশ্ব।