ফের পারমাণবিক পথে জাপান, চালু হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম কেন্দ্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৩ বার
জাপানে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্র

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের বিরতির পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর পথে হাঁটছে জাপান। দেশটির নিইগাতা প্রদেশে অবস্থিত কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি রিঅ্যাক্টর আগামী সপ্তাহে চালু করার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। জাপানের জ্বালানি নীতি ও পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নতুন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি বা টেপকোর কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া প্ল্যান্ট প্রধান তাকেয়ুকি ইনাগাকি জানান, আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি রিঅ্যাক্টর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, সব ধরনের কারিগরি প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়েই রিঅ্যাক্টর চালু করার লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন।

কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিশ্বের বৃহত্তম হিসেবে পরিচিত। একাধিক রিঅ্যাক্টর নিয়ে গঠিত এই কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা জাপানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই কেন্দ্রটির ইতিহাস যেমন শক্তিশালী, তেমনি বিতর্কিতও। ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিনটি রিঅ্যাক্টর গলে যাওয়ার ঘটনার পর জাপানজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের আওতায় কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কেন্দ্রটিও বন্ধ থাকে দীর্ঘদিন।

এই সময়ে জাপানের জ্বালানি নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ে দেশটি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ কমানোর আন্তর্জাতিক চাপ এবং স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা জাপানকে আবার পারমাণবিক শক্তির দিকে ফিরতে বাধ্য করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কেন্দ্র পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া অবশ্য একেবারে মসৃণ ছিল না। গত মাসে একটি রিঅ্যাক্টর চালুর প্রাথমিক ধাপ শুরু হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বন্ধ করে দিতে হয়। কারণ হিসেবে তখন জানানো হয়, একটি অ্যালার্ম-সংক্রান্ত ত্রুটি ধরা পড়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে টেপকোর প্ল্যান্ট প্রধান তাকেয়ুকি ইনাগাকি এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, ত্রুটিটি ছিল মূলত অ্যালার্ম সিস্টেমের সেটিংসজনিত। তার দাবি অনুযায়ী, এই সমস্যার সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করেছি। এটি কোনো কাঠামোগত বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি নয়।” সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পরই পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাও জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর নতুন নিরাপত্তা মানদণ্ড আরোপ করা হয়, যার আওতায় ভূমিকম্প, সুনামি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কেন্দ্রেও এসব মানদণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

তবুও স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। নিইগাতা প্রদেশের অনেক বাসিন্দা এখনো ফুকুশিমা দুর্ঘটনার স্মৃতি ভুলতে পারেননি। তারা আশঙ্কা করছেন, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে আবারও পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো পুনরায় কেন্দ্র চালুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির কথাও বলছে।

অন্যদিকে জাপান সরকার বলছে, বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পারমাণবিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। বিশেষ করে শিল্পোন্নত জাপানের মতো দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তির বিকল্প সীমিত।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই সিদ্ধান্ত নজরে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবছে। ইউরোপের কিছু দেশ যেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার পথে, সেখানে জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশের এই পদক্ষেপ অনেকের কাছে সাহসী আবার অনেকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কেন্দ্র চালু হওয়া শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুনরারম্ভ নয়, বরং জাপানের জ্বালানি নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। যদি এই কেন্দ্র সফলভাবে ও নিরাপদভাবে চালু করা যায়, তবে ভবিষ্যতে জাপানের অন্যান্য বন্ধ পারমাণবিক কেন্দ্রও পর্যায়ক্রমে চালু করার পথ সুগম হতে পারে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর উদ্যোগ জাপানের জন্য একদিকে যেমন জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি নিরাপত্তা ও জনআস্থার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করছে দেশটিকে। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারির দিকে তাকিয়ে আছে জাপানসহ বিশ্ব, এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সফল ও নিরাপদ হয় তা দেখার জন্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত