প্রকাশ: ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। চলমান কূটনৈতিক আলোচনা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ বাস্তবতা এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের বিষয়ে চলমান ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ পুনর্ব্যক্ত করতেই এই আদেশ জারি করা হয়েছে, যা প্রয়োজনে ভবিষ্যতে সংশোধন বা আরও কঠোর করা হতে পারে।
শুক্রবার, স্থানীয় সময় ৬ জানুয়ারি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই নির্বাহী আদেশে সই করেন। আদেশে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট শতাংশের শুল্ক চূড়ান্তভাবে উল্লেখ না থাকলেও উদাহরণ হিসেবে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে। এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত সেই সব পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হতে পারে, যেসব দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এর আওতায় ইরান থেকে পণ্য ক্রয়, আমদানি কিংবা কোনো ধরনের সেবা গ্রহণ করা দেশগুলোর পণ্যও পড়তে পারে বলে আদেশে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে পরমাণু ইস্যু এবং দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা নিরসনে আলোচনা চলমান রয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার মধ্যেই এ ধরনের কঠোর অবস্থান ওয়াশিংটনের চাপ কৌশলের অংশ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান গোপনে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই নির্বাহী আদেশ নিয়ে প্রকাশ্যে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও, শুক্রবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইরান কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্রের মালিক হতে পারবে না। তার এই বক্তব্য নতুন নয়; এর আগেও একাধিকবার তিনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, কঠোর অর্থনৈতিক চাপই ইরানকে আলোচনার টেবিলে রাখতে এবং তাদের কর্মসূচি সীমিত করতে কার্যকর উপায়।
এর আগেও ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘অবিলম্বে কার্যকরভাবে, ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা যেকোনো এবং সমস্ত ব্যবসায়ের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রদান করবে।’ ওই সময়ও শুল্ক কার্যকরের সুনির্দিষ্ট কাঠামো বা সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, যা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল।
হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সর্বশেষ এই নির্বাহী আদেশ মূলত ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার একটি আইনি ভিত্তি। এতে উল্লেখ করা হয়, পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট এই আদেশ সংশোধন করতে পারেন। আদেশের ভাষায় ইরানকে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টা, সন্ত্রাসবাদে সমর্থন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড নাকি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক স্বার্থকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আদেশ শুধু ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং এটি তৃতীয় দেশগুলোকেও একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে যেসব দেশ এখনো ইরানের সঙ্গে জ্বালানি, শিল্প বা মানবিক খাতে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন করে টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন এবং কিছু উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্কে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই নির্বাহী আদেশ বা শুল্ক হুমকি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। এর আগের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তেহরান সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপকে ‘একতরফা’ ও ‘আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী’ বলে আখ্যা দেয়। একই সঙ্গে তারা দাবি করে থাকে, এসব নিষেধাজ্ঞা সাধারণ ইরানি জনগণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্ত করছে, অন্যদিকে তা আলোচনার পরিবেশকে আরও জটিলও করে তুলতে পারে। কারণ, আলোচনার টেবিলে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত চাপ অনেক সময় বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, অর্থনৈতিক চাপ ছাড়া ইরানকে তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এই সিদ্ধান্ত নজরদারির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত, তবুও বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামের ওপর এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব আমদানি নির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে পড়া স্বাভাবিক।
সব মিলিয়ে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন অধ্যায় নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য নতুন টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামনে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি, ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য দেশের অবস্থানই নির্ধারণ করবে, এই হুমকি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং এর প্রভাব কত দূর পর্যন্ত গড়ায়।