রাশিয়ার তেল ইস্যুতে সুর নরম, ভারতীয় পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৪ বার
রাশিয়ার তেল ইস্যুতে সুর নরম, ভারতীয় পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার ট্রাম্পের

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে কয়েক মাস ধরে যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল, তার বড় ধরনের অবসান ঘটালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারতীয় পণ্যের ওপর আগে আরোপ করা অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তিনি শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্বস্তিই আনেননি, বরং ওয়াশিংটন–নয়াদিল্লি সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

চলতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে ঘোষিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর সই করা নির্বাহী আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ভারত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি পণ্য কেনা এবং আগামী এক দশক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের রূপরেখা তৈরির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে নয়াদিল্লি।

নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১২টা ১ মিনিট (ইস্টার্ন টাইম) থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে গত বছরের শেষ দিকে যে শুল্কহার ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলো। এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ সস্তা তেল আমদানির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও ভারত সেই নিষেধাজ্ঞায় সরাসরি যুক্ত হয়নি। বরং জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্য অব্যাহত রাখে। এর জেরে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে চাপ সৃষ্টি করেছিল।

তবে সর্বশেষ বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে দুই দেশ। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন হিসেবেই শুল্ক প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত বলে ব্যাখ্যা করছে হোয়াইট হাউস।

চুক্তি অনুযায়ী, শুধু অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কই নয়, বরং ভারতীয় পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্কের হারও ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। যদিও এই শুল্কহ্রাস একসঙ্গে কার্যকর না হয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। তবু এই ঘোষণাকেই দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত পৃথক এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ভারতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু উড়োজাহাজ এবং উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের ওপর থেকেও শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলারের জ্বালানি, উড়োজাহাজ, প্রযুক্তিপণ্য, মূল্যবান ধাতু ও কয়লা আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এই আমদানি পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই নয়, ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়াকে একঘরে করার পশ্চিমা প্রচেষ্টায় ভারতকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। শুল্ক ছাড় ও বাণিজ্য সুবিধার মাধ্যমে ভারতকে সেই পথে আনাই ছিল ওয়াশিংটনের মূল কৌশল।

একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করেছে। ট্রাম্প বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর ‘অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছেন। দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার বিষয়টি এই চুক্তির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েন্ডি কাটলার মনে করেন, নতুন শুল্ক কাঠামোর ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পাবেন। তাঁর ভাষায়, ১৮ শতাংশ শুল্ক হার ভারতকে ওই অঞ্চলের প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে রাখবে, কারণ অন্যান্য দেশকে এখনো ১৯ থেকে ২০ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হচ্ছে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। সেখানে শুল্ক কমলে তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, বস্ত্র ও প্রকৌশল পণ্যসহ বিভিন্ন খাত সরাসরি লাভবান হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ালে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন বিকল্প উৎস তৈরি হবে।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ, রাশিয়ার তেল ভারতের জন্য তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সহজলভ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কতটা প্রতিযোগিতামূলক হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। কয়েক মাসের কূটনৈতিক উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে এই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাস্তব প্রয়োগ ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতটা সফল হয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরের কেন্দ্রে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত