প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় একটি মসজিদে সংঘটিত ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১৬৯ জন। হামলাটি পাকিস্তানের রাজধানীতে সাম্প্রতিককালে সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনার মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে ইসলামাবাদের পাঁচ তারকা ম্যারিয়ট হোটেলে সংঘটিত আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৬০ জন নিহত হয়েছিল, তখন হোটেলের একটি অংশ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছিল।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, ইসলামাবাদের উপকণ্ঠের তারলাই এলাকায় অবস্থিত ইমাম বারগাহ কাসর-ই-খাদিজাতুল কুবরা মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে। মসজিদটি শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারীদের প্রধান উপাসনাস্থল হিসেবে পরিচিত। নিহত ও আহতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। হামলার সময় মুসল্লিরা জুমার নামাজ আদায় করছিলেন। নিরাপত্তা সূত্র জানায়, হামলাকারী যখন মসজিদের ফটকে পৌঁছান, তখন নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে বাধা দিতে চেষ্টা করেন। হামলাকারী বাধার মুখে পড়ার পর নিজেকে বিস্ফোরক ভেস্টের মাধ্যমে আত্মঘাতীভাবে বিস্ফোরিত করেন।
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, হামলাকারী ও তাঁর সম্ভাব্য সহযোগীর সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক নিরাপত্তাকর্মীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আত্মঘাতী হামলাকারী মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলেও নিরাপত্তাকর্মীরা লক্ষ্যবস্তুতে গুলি চালান। হামলাকারীর উরুতে গুলি লাগে এবং তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মুসল্লি মোহাম্মদ কাজিম (৫২) জানান, “নামাজ চলাকালীন সময় হঠাৎ একটি ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটে। চারপাশে ধ্বংসযজ্ঞ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।”
ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, আইএসের যোদ্ধা বিস্ফোরক বোঝাই ভেস্টে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মুসল্লিদের লক্ষ্য করেন। হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। ইসলামাবাদের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার এবং বিস্ফোরণজনিত ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করে। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তাদের চিকিৎসা চলমান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ হামলার ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সকলকে বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন। পাকিস্তানে জনসংখ্যা আনুমানিক ২৪ কোটি ১০ লাখ, যেখানে সুন্নি মুসলিমদের সংখ্যাগুরু। শিয়া সম্প্রদায় সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা প্রায়শই জঙ্গি হামলার শিকার হয়ে থাকে। বিশেষ করে কট্টরপন্থী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) পূর্বেও শিয়া সম্প্রদায়ের উপর হামলা চালিয়েছে।
স্থানীয় মুসল্লি ইমরান মাহমুদ বলেন, “হামলার সময় স্বেচ্ছাসেবক নিরাপত্তাকর্মীরা হামলাকারীর ওপর গুলি চালান, এতে তিনি মসজিদে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। তবে বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে বহু মানুষ হতাহত হন।” তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আহতদের দ্রুত উদ্ধার করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সাম্প্রতিক এই হামলা শুধুমাত্র প্রাণহানির ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জেরও প্রতিফলন। এই ধরনের হামলা দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর স্থানীয় হামলার ঘটনা পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যায়।
এদিকে, ইসলামাবাদে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করার পাশাপাশি পুলিশের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা হয়েছে। মৃত ও আহতদের পরিবারকে সহায়তা দেয়ার জন্য সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা এই ধরনের তাণ্ডব রোধে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
শিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনাস্থলগুলোতে পুনরায় হামলার আশঙ্কা থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। হামলার ফলে ধর্মীয় ও সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা রাত দিন কাজ করছেন।
এই ভয়াবহ হামলার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিপজ্জনক প্রভাব পুনরায় তুলে ধরা হলো। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও পাকিস্তানের এই পরিস্থিতির প্রতি সতর্ক ও সহানুভূতিশীল মনোভাব প্রকাশ করেছে।