প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করার কোনো অপচেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না—এমন দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ইসলাম সমর্থন করে না এবং কোনো প্রকৃত ধার্মিক মানুষ কখনো অন্য ধর্মের মানুষের ক্ষতি করতে পারে না। বাংলাদেশের ইতিহাসই এর বড় প্রমাণ। যুগ যুগ ধরে এ দেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—চার ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছে।
শনিবার দুপুরে হবিগঞ্জ শহরের সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুখলিছুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় স্থানীয় নেতাকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশটি ছিল আসন্ন জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র। এই দেশের শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত। ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজনের রাজনীতি যারা করতে চায়, তারা মূলত দেশের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করতে চায়। জামায়াতে ইসলামী এমন কোনো রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, যেখানে মানুষের বিশ্বাস বা পরিচয়কে হাতিয়ার বানিয়ে সংঘাত সৃষ্টি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বংশানুক্রমিক ধারার চর্চা চলছে, যেখানে রাজার ছেলে রাজা হওয়ার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। এই ধারা ভেঙে দিয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব গড়ে তোলাই জামায়াতের লক্ষ্য। একজন সাধারণ শ্রমিকের সন্তান যদি মেধাবী হয়, তবে তার সামনে দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দরজা খোলা থাকা উচিত। এমন একটি রাজনীতির স্বপ্নই জামায়াত লালন করে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, ভোটের সময় রাজনীতিবিদদের আচরণ একরকম, আর ভোট শেষ হলে আরেকরকম। নির্বাচনের আগে তারা দরবেশ বা আউলিয়ার বেশ ধরে জনগণের কাছে আসেন, উন্নয়নের স্বপ্ন দেখান। নদীভাঙন থেকে শুরু করে সেতু, সড়ক আর উন্নয়নের গল্পে জনসভা ভাসিয়ে দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। জনগণের দুঃখ-কষ্ট তখন আর তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকে না।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরের বেশি সময় পার করেছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এই সময় যথেষ্ট। অথচ আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জন করতে পারিনি। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ভিয়েতনাম বাংলাদেশ থেকে অনেক পরে স্বাধীনতা অর্জন করেও আজ এ অঞ্চলের উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে আছে।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। চাঁদাবাজদের ভয়ে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অস্থির জীবন যাপন করছে। দুর্নীতি সমাজের প্রতিটি স্তরে এমনভাবে ঢুকে পড়েছে যে, তা এখন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই একটি সম্ভাবনাময় দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের পরিশ্রমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হয়। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতি টিকে থাকে। কিন্তু সেই শ্রমিকের নিজের ভাগ্য কেন বদলায় না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, মূল সমস্যা অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্ব। সৎ নেতৃত্ব ছাড়া কোনো জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
জামায়াতের আমির জানান, তারা অঙ্গীকার নিয়েই নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজদের হাত শক্তভাবে বন্ধ করা হবে। ব্যবসায়ীদের যেন রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। ফুটপাতের হকারদের চোখের পানি ফেলতে হবে না। দুর্নীতিবাজদের আর সাহস থাকবে না জনগণের টাকা লুট করার।
এই জনসভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব যুবায়ের। তিনি বলেন, দেশে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে সবার আগে দরকার সৎ নেতৃত্ব ও আইনের শাসন। খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় আমির ও হবিগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী আবদুল বাসিত বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন। একই দলের মহাসচিব ও হবিগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী আহমদ আবদুল কাদির বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা করেই একটি কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ছাড়া ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও হবিগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। তারা দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও বৈষম্যের রাজনীতি থেকে মুক্তি পেতে চায়। এই পরিবর্তনের জন্য জনগণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সমাবেশে উপস্থিত সাধারণ মানুষদের অনেকেই বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা উন্নয়ন আর প্রতিশ্রুতির কথা শুনে আসছেন, কিন্তু বাস্তবে তার সুফল খুব কমই পেয়েছেন। তাই তারা এমন একটি রাজনৈতিক ধারা দেখতে চান, যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন নয়, বরং ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
সার্বিকভাবে হবিগঞ্জের এই জনসভা ছিল জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। ধর্মীয় সম্প্রীতি, সৎ নেতৃত্ব এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে দলটি জনগণের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছে। সামনে নির্বাচন ঘিরে এই বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়নের পথে এগোয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।