প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় এবারও বাড়ানো হয়েছে সোনার দাম, যা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে স্বর্ণ ব্যবসায়ী—সবার মধ্যেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ ঘোষণায় ভরিপ্রতি সোনার দাম বেড়েছে ২ হাজার ২১৬ টাকা। ফলে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট সোনার নতুন মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চ মূল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন এই দাম ঘোষণা করেছে দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটি সোমবার সকালে এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই সমন্বয় করা হয়েছে। ঘোষণার দিন থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে এবং রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারিও দেশের বাজারে একই দামে সোনা বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সোনার দাম বৃদ্ধির এই খবর স্বাভাবিকভাবেই দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এক ধরনের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সোনা শুধু অলংকার নয়, বরং এটি এক ধরনের নিরাপদ বিনিয়োগ এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। বিশেষ করে বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সামাজিক আয়োজনগুলোতে সোনার গয়নার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার তাদের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ভরিপ্রতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকা। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেট সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৩ টাকা। ১৮ ক্যারেট সোনার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৫৬৮ টাকা। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ভরিপ্রতি ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৮৫ টাকা। এই মূল্য বৃদ্ধির ফলে স্বর্ণ ক্রয় এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ঘোষিত এই দামই চূড়ান্ত নয়। কারণ সোনার গয়না কিনতে গেলে এর সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করতে হয়। ফলে একজন ক্রেতাকে প্রকৃতপক্ষে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এছাড়া গয়নার ডিজাইন, কারুকাজ এবং মানের ওপর নির্ভর করে মজুরি আরও বেশি হতে পারে, যা মোট খরচকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও কাঁচা সোনার দাম বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, দাম বাড়ার কারণে বিক্রি কিছুটা কমে গেছে, তবে বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কেনার আগ্রহ এখনও রয়েছে।
এদিকে সোনার দাম বাড়লেও রুপার বাজারে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাজুসের সর্বশেষ ঘোষণায় রুপার দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ২২ ক্যারেট রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ভরিপ্রতি ৬ হাজার ৩৫৭ টাকা। ২১ ক্যারেট রুপার দাম ৬ হাজার ৬৫ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ১৯০ টাকা। সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম রাখা হয়েছে ভরিপ্রতি ৩ হাজার ৯০৭ টাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সোনার দাম বৃদ্ধি শুধু একটি বাজারগত ঘটনা নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও একটি প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়া, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে সোনা দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের অন্যতম নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে দাম বৃদ্ধির প্রভাব বহুমাত্রিক। অনেকেই সোনাকে ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি একটি আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। ফলে দাম বাড়লেও সোনার প্রতি মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি কমে যায় না।
অন্যদিকে, নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন সোনার পরিবর্তে অন্যান্য বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। তবে বিশেষ অনুষ্ঠান এবং সামাজিক ঐতিহ্যের কারণে সোনার গুরুত্ব এখনও অটুট রয়েছে। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে সোনার চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে, তাহলে স্থানীয় বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সোনার এই নতুন দাম দেশের স্বর্ণবাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এটি যেমন ক্রেতাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি নতুন পরিস্থিতি। তবে ঐতিহ্য, বিনিয়োগ এবং সামাজিক প্রয়োজন—সব মিলিয়ে সোনার গুরুত্ব বাংলাদেশের মানুষের জীবনে এখনও অপরিসীম