প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে ঘিরে নতুন এক পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীতে কর্মরত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্যের বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য জানাচ্ছে। সরকারি সামরিক উপাত্তের ভিত্তিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ হাজারেরও বেশি সেনাসদস্য একই সঙ্গে ইসরাইলি নাগরিকত্বের পাশাপাশি অন্য দেশের নাগরিকত্বও ধারণ করেন। বিষয়টি সামনে আসার পর সামরিক কাঠামোর বৈশ্বিক চরিত্র, দ্বৈত আনুগত্যের প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনাও নতুন করে শুরু হয়েছে।
এই তথ্য প্রকাশ করেছে ইসরাইলের বহুল প্রচারিত দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনথ। সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বচ্ছতা বিষয়ক সংগঠন হাৎসলাচা তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করার পর সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এসব পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সংশ্লিষ্ট মহল এটিকে ইসরাইলি সামরিক সদস্যদের বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রথম বিস্তৃত প্রকাশ্য তথ্য হিসেবে দেখছে, কারণ এর আগে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা জনসমক্ষে খুব কমই এসেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোট ৫০ হাজার ৬৩২ জন সেনার দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সদস্যের নাগরিকত্ব রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র–এর, যাদের সংখ্যা ১২ হাজার ১৩৫ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ফ্রান্স, যেখানে নাগরিকত্বধারী সেনার সংখ্যা ৬ হাজার ১২৭ জন। তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাশিয়া, যাদের সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন দেশের নাগরিকত্বধারী সদস্যদের উচ্চ উপস্থিতি ইসরাইলের অভিবাসন ইতিহাস ও প্রবাসী ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাষ্ট্রটির দীর্ঘ সম্পর্কের প্রতিফলন।
পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, তিন হাজারের বেশি সেনার নাগরিকত্ব রয়েছে জার্মানি–এর, এবং প্রায় একইসংখ্যক সদস্যের রয়েছে ইউক্রেন–এর নাগরিকত্ব। এক হাজারের বেশি সেনা একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য–এর নাগরিক, আর রোমানিয়া–এর নাগরিক ১ হাজার ৬৮৬ জন, পোল্যান্ড–এর নাগরিক ১ হাজার ৩৮৭ জন এবং কানাডা–এর নাগরিকত্বধারী সেনার সংখ্যা ১ হাজার ১৮৫। বাকিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব ধারণ করেন। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইয়েমেন, তিউনিসিয়া, লেবানন, সিরিয়া এবং আলজেরিয়া–সহ কয়েকটি আরব দেশের নাগরিকত্বধারী সেনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখানো হয়েছে।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, অন্তত ৪ হাজার ৪৪০ জন সেনা শুধু দ্বৈত নয়, বরং তিনটি নাগরিকত্ব ধারণ করেন। একই সঙ্গে ১৬২ জন সদস্যের তিনটিরও বেশি দেশের নাগরিকত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বহুনাগরিকত্ব আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে অস্বাভাবিক নয়, তবে সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আনুগত্য এবং আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন জড়িত থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তথ্যের জন্য আবেদন করা হয়েছিল ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এবং প্রায় এক বছর পর তা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যটি প্রস্তুত ও যাচাই করতে দীর্ঘ সময় লাগার অর্থ হলো সেনাবাহিনীর ভেতরে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত ডেটা সংগ্রহ একটি জটিল প্রক্রিয়া। তাছাড়া সেনাবাহিনী স্পষ্ট করেনি যে এই পরিসংখ্যানে সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সদস্য, রিজার্ভ বাহিনী নাকি উভয় শ্রেণিই অন্তর্ভুক্ত। এই অস্পষ্টতা থেকেই অনেক প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে প্রকৃত শতাংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে।
ইসরাইলি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সেনার সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার, আর নিবন্ধিত রিজার্ভ সদস্যের সংখ্যা চার লাখ থেকে চার লাখ ৬০ হাজারের মধ্যে। যদি প্রকাশিত দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের সংখ্যা এই বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হয়, তাহলে তা সামরিক বাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নির্দেশ করে। ফলে বিষয়টি শুধু পরিসংখ্যানগত নয়, বরং কৌশলগত ও রাজনৈতিক গুরুত্বও বহন করে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, ইসরাইল একটি অভিবাসনভিত্তিক রাষ্ট্র হওয়ায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্বধারী মানুষের উপস্থিতি সেখানে স্বাভাবিক। বহু প্রবাসী পরিবার দীর্ঘদিন বিদেশে বসবাসের পর দেশটিতে ফিরে এসে নাগরিকত্ব বজায় রাখেন। সেই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীতে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী সদস্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে অন্য অংশের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামরিক বাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে বিদেশি নাগরিকত্বধারী সদস্যের সংখ্যা বেশি হলে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এই তথ্য প্রকাশের সময়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি সংবেদনশীল মুহূর্তে এসেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজা উপত্যকা–কে কেন্দ্র করে সংঘাত ও সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও নিরাপত্তা ইস্যুতে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর কাঠামো, সদস্যদের পটভূমি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রভাব নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সামরিক বাহিনীর গঠন ও সদস্যদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ স্বচ্ছতার একটি ইতিবাচক উদাহরণ। এতে নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেনাবাহিনীর কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায়। অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এমন তথ্য প্রকাশ কখনো কখনো কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে, কারণ শত্রুপক্ষ সেনাবাহিনীর সামাজিক ও জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও আলোচনার বিষয় হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশের নাগরিকত্বধারী সেনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে, তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ কোনো দেশের নাগরিক অন্য দেশের সেনাবাহিনীতে কাজ করলে আইনি ও কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন নীতি রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রকাশিত তথ্যটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং আধুনিক বিশ্বায়িত সমাজে সামরিক বাহিনীর গঠন কতটা বহুজাতিক হতে পারে তার একটি বাস্তব উদাহরণ। এটি যেমন ইসরাইলের অভিবাসনভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন, তেমনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতাকেও সামনে আনে। এখন নজর থাকবে, এই তথ্য প্রকাশের পর দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতি, সামরিক কাঠামো বা আন্তর্জাতিক আলোচনায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না।