প্রকাশ: ১৫ জুলাই | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সমুদ্রের অগভীর নীল জলরাশি থেকে শুরু করে গভীর অতলান্তিক—সবখানেই রাজকীয় ভঙ্গিতে বিচরণ করে তিমি মাছ। আকারে বিশাল হলেও এরা প্রকৃতির আশ্চর্য এক সংযম আর সূক্ষ্ম শারীরবৃত্তীয় অভিযোজনের নিদর্শন। অন্যসব স্তন্যপায়ীর মতো তিমিকেও শ্বাস নিতে হয় বাতাস থেকে। কিন্তু মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস যেখানে স্বয়ংক্রিয়, তিমির ক্ষেত্রে সেটি মোটেও স্বয়ংক্রিয় নয়—এটি পুরোপুরি তাদের সচেতন নিয়ন্ত্রণের অধীন।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, তিমি মাছ সহজেই ৩০ মিনিট পর্যন্ত দম না নিয়েই জলে থাকতে পারে। এর মানে এই নয় যে এরা মাঝেমধ্যেই ওই আধাঘণ্টা করে চোখ বন্ধ করে আরামে ঘুমিয়ে নেয়। আসলে প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মে এদের জন্য একটানা গভীর ঘুম বিপজ্জনক হতে পারে। যদি তিমি পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়ে আর সময়মতো জেগে না ওঠে, তবে দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এ শ্বাস-নির্ভর বিপদ এড়াতেই তিমি মাছের মস্তিষ্ক দুই ভাগে ভাগ হয়ে এক অদ্ভুত পদ্ধতিতে কাজ করে।
বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রো এনসেফালোগ্রাফি বা ইইজি পদ্ধতিতে পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, ঘুমের সময় তিমির মস্তিষ্কের অর্ধেক অংশ ঘুমায়, আর বাকি অর্ধেক জেগে থাকে। এই জাগ্রত অংশ তিমিকে নিয়মিতভাবে শ্বাস নিতে এবং প্রয়োজনে পানির উপরিভাগে ভেসে উঠতে সাহায্য করে। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক প্রক্রিয়া সচেতন নিয়ন্ত্রণেই থেকে যায়। মাঝেমধ্যে বিশালদেহী এই সামুদ্রিক প্রাণীকে সমুদ্রের উপরিভাগে নিস্তেজ ভঙ্গিতে ভাসতে দেখা যায়—সেই অবস্থাটিই আসলে তিমির ঘুম।
তিমির এই ঘুম অনেকটা মানুষের অর্ধ-জাগ্রত অবস্থার মতোই। আমরা যেমন গভীর ঘুম আর হালকা ঘুমের সীমারেখায় থেকে স্বপ্নের জগতে ভেসে যাই, তেমনি তিমি মাছও আধা ঘুম আর আধা জাগরণের মধ্যে টিকে থাকে—শুধু শ্বাস নেবার জন্য নয়, শিকারি প্রাণী বা হিংস্র হাঙরের আক্রমণ থেকেও সতর্ক থাকার জন্য।
সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন জটিল শারীরিক অভিযোজন প্রকৃতিতে খুবই বিরল। শ্বাস-প্রশ্বাস ও ঘুমকে একসঙ্গে এমনভাবে সামলানোর ক্ষমতা তিমিকে করেছে সমুদ্রের অন্যতম বুদ্ধিমান ও অভিযোজিত প্রাণী। মানুষের মতো স্বয়ংক্রিয় নয়, বরং শ্বাস নিতে প্রতি মুহূর্তে সচেতন থাকা—এটিই তিমির বাঁচার অন্যতম শর্ত। আর এই অর্ধেক ঘুম আর অর্ধেক জাগরণই প্রমাণ করে, প্রকৃতি কখনো কখনো আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বিস্ময়কর।








