প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথকে কেন্দ্র করে। সংসদ সচিবালয় মঙ্গলবার সকাল থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার প্রস্তুতি রেখেছিল। তবে, পরিকল্পিত কর্মসূচি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামসহ তার জোটের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শনিবার থেকে শুরু হওয়া শপথ গ্রহণের প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে, বিএনপি জানিয়েছে, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন, কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন না। কক্সবাজার–১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ‘‘আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। জাতীয় সংসদে সাংবিধানিকভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।’’ তিনি বলেন, দলীয় চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শপথ গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছে। জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানিয়েছেন, তাদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা উভয় শপথ গ্রহণ করবেন। তিনি বলেন, ‘‘দুপুর ১২টায় আমাদের শপথ অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত হয়েছে। তবে বিএনপি যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করে, তাহলে জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না। কারণ তারা মনে করেন, সংস্কারবিহীন সংসদ অর্থহীন।’’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু শপথের বিষয় নয়, বরং নতুন সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় জোটভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর প্রতীকী প্রভাব ফেলতে পারে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ একদিকে আইন প্রণয়নে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করে।
এ ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, একদিকে বিএনপি শপথ নিলেও অন্য শাখায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকায় কি জোটের একতা ক্ষুণ্ণ হবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের মধ্যে কৌশলগত অবস্থান প্রমাণের চেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। জোটের ভেতর এই ধরণের উত্তেজনা পরবর্তী সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের প্রেক্ষাপটে জানা গেছে, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট গ্রহণ হয়নি। এছাড়া দুটি আসনে ফলাফলের গেজেট প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শপথ গ্রহণ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও নাগরিক আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তারা আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেন এবং সরকারের নীতি প্রণয়নে প্রভাব ফেলতে পারেন। এবার বিএনপি শপথ নিলে, কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিলে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
জোটের নেতারা মনে করছেন, শপথ গ্রহণ নিয়ে এ ধরণের দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার অংশ হলেও ভবিষ্যতে এটি সরকারী নীতির কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনের ফলাফলের প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াতের এই শপথের পার্থক্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরিস্থিতি বিচার করলে দেখা যাচ্ছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ গ্রহণ বা না গ্রহণের বিষয়টি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে জোটভিত্তিক পদক্ষেপের দিক নির্দেশক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ সংক্রান্ত এই বিরোধ রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও ভবিষ্যতে সরকারের কাঠামো ও জোটের কার্যক্রমে তা প্রভাব ফেলতে পারে। শপথ অনুষ্ঠান এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার এই মিলন দর্শকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে।