ইরান উত্তেজনায় ইসরাইলে যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদার: নেতানিয়াহু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ বার
ইরান ইসরাইল যুদ্ধ উত্তেজনা

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও ঘনিয়ে উঠছে সংঘাতের আশঙ্কা। সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সামনে রেখে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশের নিরাপত্তা ও জরুরি সেবাসংস্থাগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি মাথায় রেখে দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ড, উদ্ধার সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ইউনিটগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

ইসরাইলের প্রভাবশালী দৈনিক ইয়েডিওথ আহরোনোথ জানিয়েছে, নেতানিয়াহু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সম্ভাব্য যুদ্ধাবস্থার জন্য জরুরি প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং নাগরিক সুরক্ষার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, ইরান ইস্যুতে নির্ধারিত নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠক হঠাৎ স্থগিত করে কয়েক দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়নের জন্য সময় নেওয়াই এর পেছনের কারণ হতে পারে।

ইসরাইলি নিরাপত্তা মহলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন শিগগিরই ইরান–এর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের বিভিন্ন দাবি তেহরান আলোচনার টেবিলে প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, ইরান সময়ক্ষেপণ ও বিভ্রান্তির কৌশল নিচ্ছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তাহলে ইসরাইল সরাসরি অংশ নিক বা না নিক, প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে—এমন আশঙ্কা এখন দেশটির নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে জোরালো হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক সীমিত পরিসরের নিরাপত্তা বৈঠকগুলোতে ইসরাইলি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। এসব আলোচনায় ধারণা করা হয়েছে, সংঘাত শুরু হলে তা দ্রুত আঞ্চলিক রূপ নিতে পারে। কারণ ইরান শুধু নিজস্ব সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিত্রগোষ্ঠীও সম্ভাব্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে সংঘাতের বিস্তার হলে তা সীমান্তের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমানের সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন মন্তব্য করেছেন যে পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি স্পর্শকাতর। তাঁর ভাষায়, সম্ভাব্য হামলার পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে অনেক কাছাকাছি। এই মন্তব্য ইসরাইলি জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, কারণ সামরিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য সাধারণত পরিস্থিতির গভীর মূল্যায়নের ভিত্তিতেই দেওয়া হয়।

ইসরাইলি দৈনিক ইসরাইল হায়োম নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ব্যাপক আক্রমণ চালায়, তাহলে ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরাইলে আঘাত হানতে পারে। এই আশঙ্কাকে সামনে রেখে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। সামরিক ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা সেবাগুলোও সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের কাছাকাছি অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি আরেকটি বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডও ওই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মোতায়েন সাধারণত শক্তি প্রদর্শন ও প্রতিরোধমূলক কৌশলের অংশ, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে সতর্ক বার্তা দেওয়া।

কূটনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জেনেভায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠক সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে আলোচনা ফলপ্রসূ হলেও ইরান এখনো মার্কিন প্রশাসনের নির্ধারিত ‘লাল রেখা’ নিয়ে আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবাস আরাঘচি জানিয়েছেন, বৈঠকের পরিবেশ আগের তুলনায় বেশি গঠনমূলক ছিল, যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। এই বিপরীতমুখী বক্তব্য কূটনৈতিক অচলাবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে। মধ্যপ্রাচ্য ইতোমধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংঘাত ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে তা লাখো মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করতে পারে, শরণার্থী সংকট বাড়াতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক প্রস্তুতির খবর যত বাড়ছে, ততই কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আরও জরুরি হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরাইলের যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মোতায়েন এবং ইরানের অবস্থান—এই তিনটি উপাদান এখন একই সমীকরণে আবদ্ধ। বিশ্ব কূটনৈতিক মহল তাই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও বৃহত্তর সংঘাতের সূচনা করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত