প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানে গত মাসের প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের পর আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো। নতুন সেমিস্টারের শুরুতেই রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নেমেছেন শত শত শিক্ষার্থী। দীর্ঘ নীরবতার পর এই কর্মসূচিকে সাম্প্রতিক সময়ের প্রথম বড় ছাত্রসমাবেশ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
শনিবার তেহরানের প্রখ্যাত Sharif University of Technology ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকা হাতে শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। বিবিসি যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, তারা ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে ‘স্বৈরাচার’ শব্দটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei-কে ইঙ্গিত করে ব্যবহার করা হয়েছে।
একই সময়ে নিকটবর্তী এলাকায় সরকারপন্থি একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। যদিও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তেহরানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Shahid Beheshti University-এ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, তারা প্ল্যাকার্ড হাতে বসে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। একইভাবে Amirkabir University of Technology-এ সরকারবিরোধী স্লোগানসংবলিত ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজধানীর বাইরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরেও বিক্ষোভের খবর মিলেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, সেখানে শিক্ষার্থীরা ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘অধিকার আদায়ে সোচ্চার হও’ স্লোগান দেন। দেশের আরও কয়েকটি এলাকায় ছোট আকারে কর্মসূচি পালনের খবর পাওয়া গেছে। রোববারও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার বা হতাহতের কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই বিক্ষোভের পটভূমিতে রয়েছে গত মাসের সহিংসতা। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটি ছিল অন্যতম বড় গণবিক্ষোভ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Human Rights Activists News Agency দাবি করেছে, ওই দফার দমন-পীড়নে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী, শিশু এবং সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। যদিও এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি ভিন্ন। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহতদের বড় অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা সহিংসতার শিকার সাধারণ নাগরিক। সরকার আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই পরস্পরবিরোধী পরিসংখ্যান পরিস্থিতির জটিলতা বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে অচিরেই বোঝা যাবে সমঝোতা সম্ভব কি না, নাকি ভিন্ন পথে এগোতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছে যে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথে রয়েছে। ইরান অবশ্য বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ বলেই দাবি করে।
সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও আঞ্চলিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সমাধানকে জটিল করে তুলছে। প্রবাসী ইরানি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বিভক্তি স্পষ্ট। একাংশ সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে মত দিচ্ছে, অন্য অংশ বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উভয় পক্ষই সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের পুনরুত্থান তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের ইতিহাসে শিক্ষার্থীরা বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের আন্দোলন বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের প্রতিফলন কিনা তা সময়ই বলবে। তবে স্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনার সমন্বয়ে ইরান এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
সরকার কীভাবে এই নতুন বিক্ষোভ মোকাবিলা করবে এবং আলোচনার প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেবে—তা এখন দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে। আপাতত ক্যাম্পাসে উচ্চারিত স্লোগানগুলোই ইঙ্গিত দিচ্ছে, তরুণ প্রজন্ম তাদের দাবিতে পিছিয়ে যেতে রাজি নয়।