উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ১৫

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৩ বার
পেরু হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা নিহত

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন। 

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে ভয়াবহ এক বিমান দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গম পার্বত্য এলাকা আরেকিপায় বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সোমবার দেশটির বিমানবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে চারজন ক্রু সদস্য ও ১১ জন আরোহী ছিলেন, যারা উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।

বিমানবাহিনীর বিবৃতিতে জানানো হয়, দুর্ঘটনার আগে হেলিকপ্টারটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কিন্তু অভিযানের মাঝপথে হঠাৎ করেই রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও কোনো সাড়া না মেলায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এরপরই জরুরি অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়।

অনুসন্ধানকারী দল পরে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে চালা শহরের কাছাকাছি দুর্গম এলাকায় বিধ্বস্ত অবস্থায় হেলিকপ্টারটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়। উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে একে একে মরদেহ শনাক্ত করেন। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনাস্থলটি পাহাড়ি ও দুর্গম হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবু দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।

জানা গেছে, রুশ-নির্মিত এমআই-১৭ মডেলের সামরিক হেলিকপ্টারটি পিসকো শহর থেকে উড্ডয়ন করেছিল, যা অবস্থিত ইকা অঞ্চলে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবল বর্ষণ ও বন্যায় আরেকিপা অঞ্চলের বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং অনেক গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দুর্গতদের কাছে খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী যৌথভাবে ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছিল। নিহতদের সবাই ওই মানবিক মিশনের অংশ ছিলেন বলে জানানো হয়েছে।

দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিকূল আবহাওয়া, পাহাড়ি অঞ্চলের বাতাসের চাপ কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটির যেকোনো একটি বা একাধিক কারণ মিলেই এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তদন্ত কমিটি গঠন করে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি এলাকায় উড্ডয়ন সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে খারাপ আবহাওয়া থাকলে পাইলটদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় আকাশে ঘন মেঘ ছিল এবং মাঝেমধ্যে ঝোড়ো বাতাস বইছিল। কেউ কেউ দূর থেকে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনেছেন বলেও দাবি করেছেন। তবে এসব তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছে না কর্তৃপক্ষ।

দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহতদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করা হবে এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। পেরুর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “যারা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে রেখে অন্যদের বাঁচাতে গিয়েছিলেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্ঘটনা শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও সামনে নিয়ে এসেছে। অনেক সময় দুর্গম অঞ্চলে বেসামরিক উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারে না; তখন সামরিক বিমান ও হেলিকপ্টারই একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে। ফলে এসব মিশনে ঝুঁকির মাত্রাও থাকে বেশি।

আরেকিপা অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময়— এখানে রয়েছে পাহাড়, আগ্নেয়গিরি ও গভীর উপত্যকা। এ ধরনের ভূপ্রকৃতিতে বিমান চলাচল স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে হলে ফ্লাইট ডাটা, আবহাওয়া তথ্য এবং যান্ত্রিক অবস্থা সবকিছুই বিশদভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। তদন্ত শেষ হলে হয়তো জানা যাবে ঠিক কী কারণে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে, যার মধ্যে বন্যা, ভূমিধস ও ঘূর্ণিঝড় উল্লেখযোগ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে বলে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে আসছেন। পেরুতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা বেড়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

মানবিক উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া এই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা তাই শুধু একটি শোকাবহ ঘটনা নয়; এটি দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার অভিযানে ব্যবহৃত বিমান ও সরঞ্জামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

এই দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলেও শোক ও সমবেদনার বার্তা আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশের নেতা ও সংস্থা নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং দুর্গতদের সহায়তায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে এই ঘটনায়।

সবশেষে বলা যায়, উদ্ধার অভিযানে গিয়ে প্রাণ হারানো এই ১৫ জন মানুষের মৃত্যু পেরুর জন্য এক গভীর বেদনার স্মারক হয়ে থাকবে। তারা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন অন্যদের বাঁচানোর প্রয়াসে। তাই তাদের এই আত্মত্যাগ শুধু একটি দেশের নয়, মানবতার ইতিহাসেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত