প্রকাশ: ২৪ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে কুর্দি প্রশ্ন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য। বিশেষ করে পিপলস প্রটেকশন ইউনিট বা ওয়াইপিজির সামরিক কাঠামো বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত শুধু সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, প্রতিবেশী ইরাকর নিরাপত্তা কৌশলেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় স্বশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র লড়াই চালানো এই সংগঠন শেষ পর্যন্ত নতুন সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ আন্তর্জাতিক শক্তির অবস্থান বদল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকেই সিরিয়া নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন সিরিয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান শিথিল করে এবং নতুন নেতৃত্বের প্রতি ইতিবাচক বার্তা দেয়। এর ফলে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমর্থন কমে যায়, যা ওয়াইপিজির কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার সরকারের সঙ্গে জানুয়ারিতে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী ওয়াইপিজির যোদ্ধারা অস্ত্র ত্যাগ করবে এবং ধাপে ধাপে রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হবে। এই চুক্তি কার্যকর হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দিদের স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোও কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চলে আসবে। অনেক বিশ্লেষক এটিকে সিরিয়ার দীর্ঘদিনের বিভক্ত ক্ষমতা কাঠামো পুনরায় একত্রিত করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এটি দেখায় যে দামেস্ক এখন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ওয়াইপিজির অবস্থান দুর্বল হওয়ার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল তুরস্কভিত্তিক কুর্দি বিদ্রোহী সংগঠন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকের বিলুপ্তি ঘোষণা। বহু বছর ধরে আঞ্চলিক কুর্দি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই সংগঠনের পতন ওয়াইপিজির মনোবল ও কৌশলগত সমর্থন দুই দিক থেকেই প্রভাব ফেলেছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহার পরিস্থিতিকে আরও দ্রুত বদলে দেয়।
এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রতিক্রিয়া পড়ছে ইরাকের ওপর। সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা মরুভূমি, পাহাড় ও বিচ্ছিন্ন বসতি অধ্যুষিত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। ফলে সীমান্তের ওপারের রাজনৈতিক বা সামরিক পরিবর্তন খুব দ্রুতই অপর পাশের নিরাপত্তা বাস্তবতায় প্রভাব ফেলে। বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ার কুর্দি অঞ্চলগুলো দুর্বল হলে সেখানকার কিছু যোদ্ধা বা সমর্থক নিরাপত্তার আশায় ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
ইরাকের ভেতরেও কুর্দিদের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উপস্থিতি রয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চল বহু বছর ধরে নিজস্ব সরকার পরিচালনা করছে। এ বাস্তবতায় সিরিয়ার কুর্দি প্রশ্নের যেকোনো সমাধান ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে— এমনটাই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। ইরাকি শিয়া নেতা মুক্তাদা আল-সদর ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের শক্তিগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয় যাতে জাতীয় স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে কুর্দি রাজনীতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মাসুদ বারজানি ও তার সহযোগীরা অতীতে আঞ্চলিক কুর্দি প্রভাব বাড়াতে সিরিয়ার পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে সিরিয়া সরকার ও কুর্দিদের সমঝোতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই ইস্যুর আঞ্চলিক বিস্তার সীমিতই থাকতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে সেনা সরিয়ে তাদের একটি অংশ ইরাকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব সেনার সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের বন্দিদেরও স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার বন্দিকে ইরাকে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি দেশটির আইনি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল সুদানি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন যাতে এসব বিদেশি বন্দিকে নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের ফলে যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিছু গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরে সিরিয়ায় জঙ্গি সদস্যের সংখ্যা বেড়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, যদিও এ ধরনের পরিসংখ্যান যাচাই করা কঠিন। তবু এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে নজরদারি জোরদার না করলে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ইরাকের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে টানাপোড়েন, আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব এবং বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর উপস্থিতি দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে। ফলে সিরিয়ার পরিবর্তিত বাস্তবতায় দ্রুত কৌশল নির্ধারণ করা বাগদাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে ইরাকের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিরিয়া সরকার যদি তাদের সীমান্ত অঞ্চল স্থিতিশীল রাখতে পারে এবং কুর্দি প্রশ্ন শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে সক্ষম হয়, তবে সেটি ইরাকের জন্যও ইতিবাচক হতে পারে। কারণ তখন সীমান্তপারের অনিশ্চয়তা কমবে এবং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর চলাচল সীমিত করা সহজ হবে। তবে বিপরীত পরিস্থিতিতে— অর্থাৎ যদি সমঝোতা বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়— তাহলে তা দ্রুতই ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
সব মিলিয়ে ওয়াইপিজির বিলুপ্তি বা একীভূতকরণ কেবল একটি সংগঠনের অস্তিত্বের সমাপ্তি নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য, কুর্দি রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণের নতুন অধ্যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছর এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তবে এখনই পরিষ্কার যে সিরিয়ার এই পরিবর্তন ইরাককে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে— সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রশ্নে।
বর্তমান বাস্তবতায় ইরাকের সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য জোরদার করা, সীমান্ত নজরদারি বাড়ানো এবং সিরিয়ার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা গভীর করা। কারণ পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এককভাবে কোনো দেশই এসব বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। আর সেই কারণেই ওয়াইপিজির অবসান শুধু সিরিয়ার ঘটনা নয়— এটি পুরো অঞ্চলের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।