প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। জেনেভায় তৃতীয় দফা আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে ভাষায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ‘কখনও কখনও শক্তি ব্যবহার করতেই হয়’—হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে দেওয়া তার এই মন্তব্য কেবল কূটনৈতিক হতাশা নয়, বরং সম্ভাব্য কৌশলগত সংকেত বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।
স্থানীয় সময় শুক্রবার জেনেভা বৈঠক শেষে ট্রাম্প বলেন, আলোচনায় অগ্রগতির কথা শোনা গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে ত্যাগে রাজি হয়নি। তার ভাষায়, “আমরা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেইনি। তারা যেভাবে আলোচনা করছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট নই।” একইসঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা হতে পারে।
জেনেভায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলে উভয় পক্ষই ইঙ্গিত দিলেও, চূড়ান্ত সমঝোতার পথে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে পারস্পরিক অবিশ্বাস। তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ দাবি করলেও ওয়াশিংটন বলছে, কর্মসূচির কিছু দিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্য কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
উত্তেজনার মাত্রা যে কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তা বোঝা যাচ্ছে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপে। তেহরানে নিজেদের দূতাবাস থেকে কর্মী প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাজ্য। চীন, ভারত, কানাডাসহ কয়েকটি দেশ নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। জার্মানি ও ফ্রান্স সতর্কতা জোরদার করেছে। এমনকি ইসরাইল থেকে জরুরি নয় এমন সরকারি কর্মীদের ফেরার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পদক্ষেপ সাধারণত তখনই নেওয়া হয়, যখন পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কা থাকে।
এই সংকটময় সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-এর ইসরাইল সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-র সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে ইরান ইস্যু, আলোচনার অগ্রাধিকারে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ফলে ওয়াশিংটন-তেলআবিব সমন্বয় এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা পাচ্ছে।
অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তুলনামূলকভাবে সংযত বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানই যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। তবে সবকিছু নির্ভর করবে ইরানের পদক্ষেপের ওপর। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রশাসনের ভেতরে এখনো আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাওয়া হচ্ছে, যদিও চাপ সৃষ্টির কৌশল সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে কৌশলগত স্থানে। বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরীগুলোর একটি USS Gerald R. Ford বর্তমানে ইসরাইলের উপকূলে অবস্থান করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন মোতায়েন সাধারণত কেবল প্রতিরোধমূলক বার্তা নয়, বরং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতিরও ইঙ্গিত দেয়।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্পের মন্তব্য কি তাৎক্ষণিক সামরিক অভিযানের পূর্বাভাস, নাকি কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে চাপ সৃষ্টির কৌশল? অতীতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক বহুবার চরম উত্তেজনার মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ায়নি। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হতে পারে, যেখানে কঠোর ভাষা ও সামরিক প্রদর্শন কূটনৈতিক ফল অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এদিকে তেহরান থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, ইরান তাদের সার্বভৌম অধিকার থেকে সরে আসবে না। পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ—এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে তারা। একইসঙ্গে ইরান সতর্ক করেছে যে, বাহ্যিক চাপ বা হুমকি তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে প্রভাব ফেলবে না। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সংঘাতের প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও পরিস্থিতি স্পর্শকাতর। তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও এর প্রভাব তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ‘শক্তি ব্যবহার’ সংক্রান্ত মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন এক অনিশ্চয়তার মাত্রা যোগ করেছে। যদিও এখনো আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবুও সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক ভাষ্যের কঠোরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আগামী দিনগুলোতে জেনেভা আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে কি না, কিংবা ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থান কতটা নমনীয় হয়—তা-ই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চিত্র।
এই মুহূর্তে বিশ্ব তাকিয়ে আছে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কূটনীতির টেবিল কি আবারও উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারবে, নাকি শক্তির ভাষাই প্রাধান্য পাবে—তার উত্তর নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিচক্ষণতা, ধৈর্য এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।