প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র রমজান মাসের রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্যপূর্ণ এক আয়োজনে অংশ নিতে যাচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র-এ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত ইফতার মাহফিলে তিনি যোগ দেবেন বলে নিশ্চিত করেছে বিএনপির মিডিয়া সেল। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিতব্য এই আয়োজনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ঐতিহ্যগতভাবে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বড় পরিসরে ইফতারের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বিশিষ্ট আলেম-ওলামা, পেশাজীবী ও কূটনীতিকদেরও রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী শনিবার সকাল ১০টায় তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অধীনস্থ দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন তারেক রহমান। প্রশাসনিক কার্যক্রম ও চলমান উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শেষে বিকেলে তিনি জামায়াতের আয়োজিত ইফতার মাহফিলে যোগ দেবেন। সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার অংশ হিসেবেই এই অংশগ্রহণকে দেখা হচ্ছে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং মাওলানা আবদুল হালিম। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইফতার মাহফিলের আমন্ত্রণপত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। সেই সাক্ষাৎকারেই প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সম্মতি জানান বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও রমজানের মতো ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উপলক্ষে পারস্পরিক সৌজন্য বিনিময়ের এই দৃষ্টান্তকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রমজান মাসে ইফতার মাহফিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি মঞ্চ। বিভিন্ন দলের নেতাদের একই টেবিলে বসার সুযোগ তৈরি হয়, অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনার পরিবেশ গড়ে ওঠে। ফলে এমন আয়োজন রাজনৈতিক দূরত্ব কমাতে সহায়ক হতে পারে বলেও বিশ্লেষকদের মত।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর এই অংশগ্রহণ বহুমাত্রিক বার্তা বহন করতে পারে। একদিকে এটি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহনশীলতার প্রতীক, অন্যদিকে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটি একটি ইফতার অনুষ্ঠান, তবুও উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির রাজনীতি বাংলাদেশে সবসময়ই আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে।
এদিকে, ইফতার মাহফিলকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই ভেন্যুতে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। আয়োজক দল জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
রমজান মাস আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ইফতারের টেবিলে বসে সৌহার্দ্যের বার্তা দেওয়াকে অনেকে ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংলাপ ও পারস্পরিক সম্মানবোধের চর্চা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ এটিকে সৌজন্যমূলক ও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন। তবে সরকারি বা দলীয়ভাবে এখনো পর্যন্ত এ নিয়ে অতিরিক্ত কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজন, যার লক্ষ্য রমজানের তাৎপর্য তুলে ধরা এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় উপলক্ষকে কেন্দ্র করে আয়োজন নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন দলের নেতারা একে অপরের আমন্ত্রণে ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়েছেন। অনেক সময় এসব আয়োজন পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক সম্পর্কের উষ্ণতা বা শীতলতার ইঙ্গিতও বহন করেছে। ফলে এবারের আয়োজনও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে শনিবারের ইফতার মাহফিল কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনা হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই সৌজন্য সাক্ষাৎ ও অংশগ্রহণ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না।
রমজানের পবিত্রতা ও সহমর্মিতার বার্তা সামনে রেখে আয়োজিত এই ইফতার মাহফিল দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত রাজনৈতিক বিভাজনের মাঝেও সৌজন্য ও সংলাপের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে এ আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।