প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শোকজ নোটিশ পাওয়ার পর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন শেখ তানভীর বারী হামিম। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কবি জসীম উদ্দীন হলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সংগঠনের দফতর সম্পাদক (সহ-সভাপতি পদমর্যাদা) মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে হামিমকে শোকজ করা হয়। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। যদিও চিঠিতে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ্যে উল্লেখ করা হয়নি, তবে হামিম নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি ইফতার মাহফিল আয়োজন করাই শোকজের কারণ।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেন তিনি। পরদিন জানতে পারেন, ওই আয়োজনের কারণে তাকে শোকজ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি তাকে ব্যক্তিগতভাবে জানানো হয়নি; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। তার ভাষায়, “আমাকে লিখিতভাবে শোকজ দিতে বলেছে। কিন্তু আমি দেব না একটি কারণে—আমাকে ব্যক্তিগতভাবে শোকজপত্র দেওয়া হয়নি।” তিনি আরও বলেন, সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে শোকজ দেওয়ার ফলে বিষয়টি জনসম্মুখে চলে এসেছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ফোন করে জানতে চাইছে, তিনি কী ধরনের অন্যায় করেছেন।
ক্যাম্পাস রাজনীতিতে শৃঙ্খলাজনিত পদক্ষেপ নতুন নয়। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত সংগঠনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়। হামিমের বক্তব্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্তিগত নোটিশ প্রদান না করে সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করায় তিনি ক্ষুব্ধ। তার দাবি, যদি কোনো বড় ধরনের সাংগঠনিক অপরাধ হয়ে থাকে, তবে তা ব্যক্তিগতভাবে জানানোই ছিল যৌক্তিক। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামিম পরিচিত মুখ। তিনি বিগত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই সূত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তার পরিচিতি রয়েছে। সমর্থকদের একাংশ বলছেন, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইফতার আয়োজন করা কোনো অপরাধ হতে পারে না; বরং এটি একটি সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মসূচি। অন্যদিকে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ নিয়ম-কানুনের প্রশ্নে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে অনেকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ছাত্ররাজনীতিতে কেন্দ্র ও হল বা ইউনিট পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অনেক সময় কর্মসূচি আয়োজনের আগে কেন্দ্রীয় অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক থাকে। সে ক্ষেত্রে অনুমোদন না থাকলে শোকজের মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।
হামিম তার ভিডিও বার্তায় ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি সংগঠনের ভেতরে আলোচনা চান। প্রকাশ্যে তিনি কোনো কঠোর ভাষা ব্যবহার না করলেও, ব্যক্তিগতভাবে নোটিশ না পাওয়াকে তিনি অসম্মানজনক হিসেবে দেখছেন। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই বিষয়টির সমাধান চান, তবে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করছেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বরাবরই জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন বহন করে। এখানকার ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রম, দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্ত জাতীয় অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দেয়। রমজান মাসে ইফতার আয়োজনকে কেন্দ্র করে শোকজ নোটিশের ঘটনা তাই কেবল একটি সাংগঠনিক বিষয় নয়; বরং এটি ছাত্ররাজনীতির ভেতরের শৃঙ্খলা ও যোগাযোগব্যবস্থার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
এ মুহূর্তে সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পরবর্তী অবস্থানের দিকে। হামিম লিখিত জবাব দেবেন কি না, কিংবা সংগঠন তার বিরুদ্ধে পরবর্তী কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার বক্তব্য ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি করেছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, একটি ইফতার আয়োজনকে ঘিরে শুরু হওয়া এই বিতর্ক ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, যোগাযোগের প্রক্রিয়া এবং প্রকাশ্য বনাম ব্যক্তিগত নোটিশ প্রদানের প্রশ্নে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে ছাত্ররাজনীতির কার্যপদ্ধতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসে, নাকি বিষয়টি আরও জটিলতার দিকে গড়ায়।