প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া-এ অবতরণের সময় একটি সামরিক কার্গো উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ১১ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এল আলতো-তে স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পরপরই বিমানবন্দর এলাকায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়।
বলিভিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উড়োজাহাজটি পূর্বাঞ্চলীয় শহর সান্তা ক্রুজ থেকে ছেড়ে এসে এল আলতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, অবতরণের সময় বিমানটি রানওয়ে স্পর্শ করার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। পরে এটি কাছের একটি মহাসড়কে গিয়ে আছড়ে পড়ে, যেখানে কয়েকটি যানবাহন চলাচল করছিল। ফলে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
দুর্ঘটনার মুহূর্তে বিমানবন্দরের আশপাশে অবস্থানরত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অবতরণের ঠিক আগে বিমানটি অস্বাভাবিকভাবে দুলতে দেখা যায়। কেউ কেউ জোরালো শব্দ শোনার কথাও বলেছেন। এরপর আচমকা ধোঁয়ার কুণ্ডলী ও আগুনের শিখা দেখা যায়। দুর্ঘটনার পরপরই দমকল বাহিনী, সেনা সদস্য ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে পাঠানো হয়। নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে সামরিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে নিহতদের বেশিরভাগই বিমানটির ক্রু ও সামরিক কর্মী।
এল আলতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা লা পাজ মহানগর এলাকার প্রধান বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হয়, দুর্ঘটনার পর সাময়িকভাবে সব ধরনের উড়োজাহাজ ওঠানামা বন্ধ ঘোষণা করে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সূচিতে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে। যাত্রীদের অনেকে বিমানবন্দরে আটকা পড়েন এবং পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।
বলিভিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং নিহতদের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিমানটির ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডার উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে, যাতে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা যায়। প্রাথমিকভাবে আবহাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা মানবিক ভুল—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এল আলতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, যা বিশ্বের উচ্চতম বাণিজ্যিক বিমানবন্দরগুলোর একটি। উচ্চতার কারণে এখানে অবতরণ ও উড্ডয়ন প্রযুক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। পাতলা বাতাসের কারণে বিমানের ইঞ্জিন ও ব্রেকিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। যদিও অভিজ্ঞ পাইলটরা নিয়মিত এই রুটে চলাচল করেন, তবুও সামান্য ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
দুর্ঘটনার পর শহরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, সামরিক উড়োজাহাজের নিরাপত্তা মান ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ওপর আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন কি না। সরকার অবশ্য জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
মহাসড়কে আছড়ে পড়ার ঘটনায় কয়েকটি বেসামরিক যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলোর আরোহীদের মধ্যে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সেবা জোরদার করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কিছু আহতের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও ঘটনাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রতিবেশী দেশগুলো শোক প্রকাশ করেছে এবং প্রয়োজনে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। বিমান দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়া সাধারণত ব্রেকিং সিস্টেম ব্যর্থতা, ভেজা রানওয়ে, অতিরিক্ত গতি অথবা প্রযুক্তিগত ত্রুটির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
বলিভিয়া অতীতে কয়েকটি সামরিক ও বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এই দুর্ঘটনা দেশটির বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
উদ্ধারকর্মীরা রাতভর তৎপরতা চালিয়ে যান। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। দুর্ঘটনাস্থল ঘিরে রাখা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে এল আলতোতে সামরিক কার্গো উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনা বলিভিয়াকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে। নিহতদের পরিবারের জন্য এটি এক অপূরণীয় ক্ষতি। একইসঙ্গে দেশটির বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে এই দুর্ঘটনা। এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের ফলাফলের দিকে, যা নির্ধারণ করবে ঠিক কী কারণে অবতরণের মুহূর্তে প্রাণঘাতী এই বিপর্যয় ঘটল।