প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফাল্গুন মাসের হালকা উষ্ণতা এখনো পুরোপুরি দহনজ্বালায় রূপ নেয়নি। তবে গরম শুরুর আগেই বাজারে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে বৈদ্যুতিক পাখা বা ফ্যানের দাম। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, জাতীয় স্টেডিয়াম মার্কেট ও বায়তুল মোকাররম এলাকার ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় প্রতিটি সিলিং ফ্যানের দাম বেড়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, কোথাও কোথাও ৬০০ থেকে ৭০০ টাকাও বেশি চাওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্রীষ্মের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বাড়লে দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
বর্তমানে দেশে সিলিং ফ্যানের বার্ষিক চাহিদা ৫০ থেকে ৬০ লাখ ইউনিট। গড় মূল্য আড়াই হাজার টাকা ধরলে বাজারের আকার দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেবিল, স্ট্যান্ড, ওয়াল ও চার্জার ফ্যান মিলিয়ে এই খাতের মোট বাজার ২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে এই খাতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মোট চাহিদার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সিলিং ফ্যান এখন দেশেই উৎপাদিত হয়।
দেশীয় উৎপাদনকারী শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে যমুনা ইলেকট্রনিকস, আরএফএল, ওয়ালটন, বিআরবি, কনকা এবং এনার্জিপ্যাক। একসময় ভারত, পাকিস্তান ও চীন থেকে ফ্যান আমদানি করা হলেও এখন দেশীয় ব্র্যান্ডই বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে তামা ও পিতলের দাম বাড়ার অজুহাতে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো আগেভাগেই দাম বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের কারওয়ান বাজার শাখার সভাপতি রাকিব হাসান জানান, সাধারণত বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির ছয় মাস পর স্থানীয় বাজারে প্রভাব পড়ে। কিন্তু এবার মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে দাম বাড়ানো হয়েছে। তার দাবি, প্রতিটি ফ্যানে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম যুক্ত হয়েছে। সরকারের নজরদারি রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
কারওয়ান বাজার সুপারমার্কেটের স্বাধীন ইলেকট্রিক স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, গত বছর যে ৫৬ ইঞ্চি বিআরবি ফ্যান ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটি এখন ৩ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আরএফএল-এর একটি জনপ্রিয় মডেল ৩ হাজার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। একইভাবে যমুনার ৩ হাজার টাকার ফ্যান এখন ৩ হাজার ৪০০ টাকায়, আর ওয়ালটনের ২ হাজার ৬০০ টাকার মডেল বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদা বাড়লে দাম আরও বাড়তে পারে।
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছে। যমুনা ইলেকট্রনিকসের বিপণন পরিচালক সেলিম উল্যা সেলিম বলেন, ফ্যান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটর, বিয়ারিং, ব্লেডশিট ও কপার আমদানি করতে হয়। এসব পণ্যের ওপর শুল্ক ও ডলারের অস্থির বাজার মূল্য যুক্ত হয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাদের হিসাবে, কোম্পানি পর্যায়ে গড়ে ২০০ টাকার মতো দাম বাড়ানো হয়েছে, তবে খুচরা পর্যায়ে তার চেয়ে বেশি বাড়ছে।
আরএফএল ইলেকট্রিক্যাল অ্যালায়েন্সের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান জানান, অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্যের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তারের দাম বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ, আর মোটরের তামার দাম ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববাজারে কপারের দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে উৎপাদন ব্যয়ে। তার মতে, দাম বাড়লেও বিক্রিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না, কারণ গ্রীষ্মে ফ্যান একটি অপরিহার্য পণ্য।
বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার ফ্যান। তবে ২ হাজার টাকার নিচে পছন্দসই ব্র্যান্ডের ফ্যান পাওয়া এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। কারওয়ান বাজারে ঘুরতে গিয়ে সাইদুল হাসান নামের এক ক্রেতা জানান, রোজার মধ্যে ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ১০০ টাকায় একটি নন-ব্র্যান্ডের ফ্যান কিনেছেন। তিনি বলেন, দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও গরমের কথা ভেবে কিনতেই হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মৌসুমি পণ্য হিসেবে ফ্যানের বাজারে প্রতি বছরই গ্রীষ্মের আগে মূল্যসংশোধন দেখা যায়। সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়লেও এবার বাড়তি চাপ পড়েছে কাঁচামালের দামে। একই সঙ্গে পরিবহন খরচ ও ডলারের বিনিময় হারও মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে খুচরা বাজারে অতিরিক্ত মুনাফা যোগ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশে ফ্যান উৎপাদনের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৭৮ সালে যমুনা ইলেকট্রনিকস উৎপাদন শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে আরএফএল, ওয়ালটনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে এবং আমদানিনির্ভরতা কমেছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাও বেড়েছে। তবে কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ তীব্র হলে বিক্রি বাড়বে এবং সেই সঙ্গে মূল্যও স্থিতিশীল থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর। যদি উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, তাহলে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যথায় চাহিদা বাড়ার সুযোগে দাম আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে গরমের আগেই ফ্যানের বাজারে দামের যে উষ্ণতা দেখা দিয়েছে, তা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। উৎপাদকরা কাঁচামালের দাম ও ডলারের অস্থিরতাকে দায়ী করলেও খুচরা বাজারে অতিরিক্ত মূল্যসংযোজন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আসন্ন গ্রীষ্মে এই বাজার কতটা স্থিতিশীল থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।