অভ্যন্তরীণ চাপে কি বাড়ছে পাক–আফগান যুদ্ধ?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১ বার
অভ্যন্তরীণ চাপে কি বাড়ছে পাক–আফগান যুদ্ধ?

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার আগুন জ্বলছে। প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা ‘মিনি ওয়ার’ বা নিয়ন্ত্রিত সংঘাত বললেও, ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়া বর্তমান পরিস্থিতিকে তাঁরা স্পষ্টভাবেই ‘ওপেন ওয়ার’ আখ্যা দিচ্ছেন। কারণ, এই লড়াই আর সীমান্তে বিচ্ছিন্ন গোলাগুলিতে সীমাবদ্ধ নেই; এতে যুক্ত হয়েছে বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং একে অপরের সামরিক স্থাপনায় সরাসরি আঘাতের দাবি।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ধারাবাহিক জঙ্গি হামলার পর। ইসলামাবাদের একটি মসজিদে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ এবং বাজৌরে সেনাচৌকিতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদ কাবুলের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ তোলে। পাকিস্তানের দাবি, আফগান মাটিতে অবস্থানরত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি জঙ্গিরা সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে এবং পরে আবার আফগানিস্তানে আশ্রয় নিচ্ছে। পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন দুর্বল অংশ ব্যবহার করে জঙ্গিরা অনুপ্রবেশ করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পূর্ব আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিকা প্রদেশে টিটিপি ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। কয়েক দিনের ব্যবধানে আফগান তালেবান বাহিনী পাল্টা স্থল অভিযান শুরু করে এবং দাবি করে যে তারা পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক সামরিক চৌকি দখল করেছে। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানের অন্তত তিনটি শহরে ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং সামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। যদিও এসব দাবির অনেকটাই স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবু পরিস্থিতির তীব্রতা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।

এই সংঘাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও জটিল। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্ধারিত ডুরান্ড লাইনকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে তা মেনে নেয়নি। আফগানদের একটি অংশের দাবি, ঐতিহাসিকভাবে বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানের কিছু অংশ আফগান ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই দাবি বাস্তবায়ন কার্যত অসম্ভব, তবু সীমান্ত প্রশ্ন দুই দেশের সম্পর্ককে বারবার উত্তপ্ত করেছে। সম্পর্ক ভালো থাকলে বিষয়টি চাপা থাকে, আর সম্পর্ক খারাপ হলে তা সামনে চলে আসে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কেবল সীমান্ত বিরোধ নয়, বর্তমান সংঘাতের পেছনে রয়েছে উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। পাকিস্তান কয়েক বছর ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা ও নিরাপত্তা সংকটে ভুগছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান–কে ক্ষমতাচ্যুত করা, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও কারাবন্দিত্ব নিয়ে দেশে তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে টিটিপি ও বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা বাড়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান জাতীয়তাবাদের আবেগ উসকে দিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল হতে পারে।

পাকিস্তানের সরকারি মহল অবশ্য এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে বলছে, তারা কেবল নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাদের দাবি, আফগান তালেবান সরকার টিটিপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বরং কাবুল প্রশাসনের কিছু অংশ তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, এই অস্থিতিশীলতার পেছনে ভারতের ভূমিকা রয়েছে। তবে ভারত বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করে একে ভিত্তিহীন বলে আসছে।

অন্যদিকে, আফগানিস্তানের ভেতরেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়া, বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস এবং ব্যাংকিং খাতে নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে সাধারণ মানুষ তীব্র দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটে ভুগছে। যুবসমাজের বড় অংশ কর্মহীন। নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ ও দমনমূলক নীতির কারণে আন্তর্জাতিক মহলে কাবুলের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ। উত্তরাঞ্চলে উজবেক সম্প্রদায়ের সঙ্গে টানাপোড়েনও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাহ্যিক সংঘাত তালেবান নেতৃত্বের জন্য অভ্যন্তরীণ সমালোচনা সাময়িকভাবে স্তিমিত করার সুযোগ এনে দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

তবে কাবুল প্রশাসনের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপানো হচ্ছে। আফগান সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানি তালেবানদের বড় অংশই পাকিস্তানের নাগরিক এবং তাদের হামলা পাকিস্তানের ভেতরের রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কাবুলের দাবি, তারা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চেয়েছিল এবং অন্তত ছয়টি দেশের মধ্যস্থতায় বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি।

বর্তমান সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। দুই দেশই পরমাণু সক্ষম রাষ্ট্র না হলেও পাকিস্তান একটি পরমাণু শক্তিধর দেশ, আর আফগানিস্তান দীর্ঘ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতায় দুর্বল অর্থনীতি ও অবকাঠামো নিয়ে টিকে আছে। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জন্য। ইতোমধ্যে সীমান্ত অঞ্চলে বাসিন্দাদের স্থানান্তর, বাণিজ্য বন্ধ এবং আকাশপথে চলাচলে বিঘ্নের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ সংঘাত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফর এবং দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে ইসলামাবাদ সন্দেহের চোখে দেখছে। আবার পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চীনসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোকেও উদ্বিগ্ন করছে। ফলে এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল সীমান্ত ও নিরাপত্তা ইস্যুর সংঘাত, নাকি অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে নজর ঘোরানোর বৃহত্তর কৌশল? নিশ্চিত উত্তর দেওয়া কঠিন। বাস্তবতা হলো, উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ, ঐতিহাসিক সীমান্ত বিরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস একে অপরকে জটিলভাবে জড়িয়ে ফেলেছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এই ‘ওপেন ওয়ার’ দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে, যার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

দক্ষিণ এশিয়ার এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগই এখন একমাত্র ভরসা। যুদ্ধের দামামা যত জোরেই বাজুক, শেষ পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান আসতে পারে কেবল আলোচনার টেবিলেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত