প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে। আজ সকাল সাড়ে ৮টার তথ্য অনুযায়ী ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) ২৩৪, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের প্রকাশিত লাইভ সূচকে বিশ্বের ১১৬টি শহরের মধ্যে ঢাকা প্রথম অবস্থানে রয়েছে। এই সূচক বাস্তব সময়ে বিভিন্ন শহরের বায়ুর মান নির্ধারণ করে প্রদর্শন করে।
ঢাকার পর বিশ্বে দূষণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর, যার একিউআই ছিল ২৩২। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের দিল্লি, যেখানে একিউআই ১৯৬। এছাড়া দূষিত শহরের তালিকায় বেইজিং, কলকাতা এবং কাঠমান্ডু উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে নির্মল বায়ুর শহর হিসেবে বাটাম শীর্ষে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সল্ট লেক সিটি, স্যান ফ্রান্সিসকো এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্যানেবেরা।
এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, বায়ুর মান শূন্য থেকে ৫০ হলে তা ভালো, ৫১ থেকে ১০০ হলে মাঝারি, ১০১ থেকে ১৫০ হলে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১ থেকে ২০০ হলে অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ হলে খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-এর বেশি হলে চরম অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ঢাকার মান ২৩৪ হওয়ায় তা খুবই অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণের এই ধরনের পরিস্থিতি শ্বাসনালী, ফুসফুস ও হৃদরোগের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ এবং ক্রনিক রোগে আক্রান্তদের জন্য বায়ুদূষণ বিশেষভাবে ক্ষতিকর। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বায়ুদূষণজনিত রোগে মারা যান। এ ধরনের তথ্য আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, যা দেখায় বায়ুদূষণ কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি।
ঢাকার বায়ুদূষণের মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলো এবং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত ধোঁয়া উল্লেখ করছেন। শহরের ভিড়, যানজট এবং শহরতলির ধুলোও দূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নাগরিকদের শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা, হাঁপানি ও ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে।
অপরদিকে, পরিবেশবিদরা জানান, নাগরিকরা যদি মাস্ক ব্যবহার, গাড়ি কম ব্যবহার এবং গাছপালা রোপণের মতো সচেতন পদক্ষেপ নেন, তা দূষণের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমাতে পারে। তবে মূল সমাধান হিসেবে সরকারী নীতি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। শিল্প নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং শহরের পরিকল্পিত উন্নয়ন না হলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
ঢাকার বায়ুদূষণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্বের অন্যান্য দূষিত শহরের সঙ্গে তুলনীয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিল্লি ও লাহোরের সঙ্গে তুলনায় ঢাকার দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি কারণ শহরে জনসংখ্যা ঘনত্ব অনেক বেশি এবং স্বাস্থ্যসেবা সীমিত। শহরের স্কুল, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকা দূষিত বায়ুর কারণে সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে।
সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, সকাল-বিকেল ঘরের বাইরে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। শিশুরা স্কুলে যাওয়ার সময় মাস্ক পরছে, বয়স্করা হাঁটতে বা বাইরে সময় কাটাতে ভয় পাচ্ছে। বহু পরিবার জানাচ্ছে, তারা দিনের বেলায় বাইরে কম বের হচ্ছে। শহরের যাত্রীরা যানজট ও দূষণের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে না আসলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। তাই দূষণ কমাতে সরকার, নাগরিক এবং শিল্প খাতের একযোগে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। মাস্ক ব্যবহার, গাছপালা রোপণ, যানবাহন কমানো এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা একান্ত জরুরি।
সংক্ষেপে বলা যায়, রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ আজ বিশ্বে শীর্ষে পৌঁছেছে। একিউআই ২৩৪ হওয়ায় শহরের মানুষ ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বায়ুর মধ্যে বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, অবিলম্বে স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নগরবাসীর জীবন ও স্বাস্থ্য বিপন্ন হবে।